১৮৬৮ সালের কোন এক সকাল। পাঞ্জাবের শিয়ালকোটের কোর্টের ইহুদি ডিপুটি কমিশনার পারকিনসন বসে আছে তার কার্যালয়ে। পাশেই রয়েছে পিয়ন মির্জা গোলাম আহমাদ। যাকে তার পিতা তার হারানো জায়গীর ফিরে পাবার আশায় গোলামির আবরণে চাকুরি দিয়েছিলো এখানে। হঠাৎ ছদ্মবেশি ইংরেজ গোয়েন্দা, পাঞ্জাব মিশনারীর ইনচার্জ বাটলার এম এ-এর আগমন। দাঁড়িয়ে গেলো পারকিনসন। আপনার কোন প্রয়োজন হুযুর? আমাদের ডেকে পাঠালেই তো পারতেন! কষ্ট করে আসার প্রয়োজনটা ছিলো কি? অদূরে দাঁড়ানো ছিলো মির্জা গোলাম আহমাদ। অস্ফুট স্বরে ‘আমি ওই মুনশির সঙ্গে সাক্ষাত করতে এসেছি’ ইঙ্গিত করেই তড় তড় করে এগিয়ে গেলেন তাঁর দিকে। দীর্ঘদিন ভারতে মিশনারীর ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করে সেদিন বিদেয় নিচ্ছিল বাটলার এম এ। ভেশ পরিবর্তন করে এ ভারতবর্ষে শিকড় মজবুত করিয়েছিলো ইংরেজদের। তাদের ক্ষমতা করেছিলো সুসংহত। গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে স্বীয় হাত রঞ্জিত করেছিলো নিরাপরাধ মজলুমদের রক্তে।
আজ তার বিদেয়র দিন। অগনিত ভক্তকুল অপেক্ষায়। সামান্য কথা বলতেও উদগ্রীব দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। কিন্তু তিনি সবকিছুই ফেলে রেখে নিরব নির্জনে সাক্ষাতে এসেছেন এক পিয়নের। নাম তার গোলাম আহমাদ। যার সঙ্গে ধর্মীয় বিভিন্ন দিক নিয়ে পূর্ব থেকেই আলোচনা হত তার। গোলাম আহমাদ কথা বলতেন। ইংরেজদের খেদমতে ফিদা হওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করতেন। সুযোগও মিলে গিয়েছিলো বারকয়েক। আর সেও মনিব ভক্তির প্রকাষ্ঠা উপস্থাপন করে গোলামীর এক অনন্য নযির স্থাপন করেছিলো। তাইতো ছিলো সে স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারির ক্ষেত্রে বাটলার এম এ—এর বার বারের পরীক্ষিত, বিশ্বস্ত ও একান্ত অনুগত। সেজন্যই বিদেয়য়কালে সবাইকে ফেলে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হলো তাদের। কথা হলো। হলো অজানা অজস্র ষড়যন্ত্র।
বাটলার এম এ সেদিন ইংল্যান্ড গেলো, তার দিনকয়েক পর পারকিনসনের পরোক্ষ অনুমতি নিয়ে গোলাম আহমাদ চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে কাদিয়ান চলে এলো।
১৮৫৭ সালের আযাদি আন্দোলন এমন একটি অ্যাটমবোমা ছিলো যে, তার ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ইংরেজরা ভুলতেই পারছিলো না। ঘুমোতে পারছিলো না তা ভেবে ভেবে। হয়তো দুঃস্বপ্ন হয়েও ধরা দিতো তাদের খাবের ঘরে। তাইতো তার ১২ বছর পর ১৮৬৯ সালে ভারতের জনগনের অবস্থান, বিশেষত মুসলমানদের মনোভাব ও হালাত পর্যবেক্ষণ করতে একদল ইংরেজ প্রতিনিধিদের আগমন ঘটে এ উপমহাদেশে। যে প্রতিনিধিদলে তাদের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতি বিশ্লেষক, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় পোপসহ সব বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় ঘটেছিলো। তাদের পর্যবেক্ষণে মুসলমানদেরই সবচেয়ে গুরুতর ও খতরনাক বলে মনে হলো। তাদের কারণে যে কোন মুহূর্তে ভারতবর্ষের সিংহাসন ছাড়া লাগতে পারে—এ সমুহ সম্ভাবনাও প্রবলতর হলো। ফলে তারা পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রস্তুত করার সময় মুসলমানদের দমননীতি ও ঐক্যহীনতার উপর গুরুত্ব দিলো। বিশেষত তাদের ধর্মীয় আকিদা বিকৃতির। তাই মুসলমানদের ঐক্যকে টুকরো টুকরো করার লক্ষ্যে এমন কাউকে দাঁড় করানোর প্রস্তাব পেশ করে রিপোর্ট প্রস্তুত করলো, যে নিজেকে নবি বলে দাবি করে ইসলামের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করবে। শরিয়তের অকাট্য বিধানগুলোকে অপব্যাখ্যার সুরতে অস্বীকার করবে। বিশেষত জিহাদি চেতনা নিস্প্রভ ও প্রশমিত করে জনগনকে গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করবে। আর লাখো শহিদের তাজা খুনে সিঞ্চিত এ মাটির উপর সাদা ভাল্লুগদের শাসনক্ষমতা স্থায়ী করবে।
এ উপলক্ষ্যেই ১৮৭০ সালে লন্ডনে একটি কনফারেন্স করে তারা। যেখানে ভারত মিশনারীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়। যাদের মধ্যে ছিলো দু বছর পূর্বে বিদেয় নেওয়া সেই বাটলার এম এ। তারাও দীর্ঘপর্যবেক্ষণ করে একই প্রস্তাব রাখে সে কনফারেন্স অধিবেশনে। এ দু’দলেরই দাবি আরো শক্তিশালী হয় ১৮৭১ সালে উলিয়াম উইলসন হান্টরের পূর্ণ রিপোর্ট সামনে আসার পর। যিনি তখনকার ভায়সরায় লর্ড মায়োর নির্দেশক্রমে ১৮৬৯ সাল থেকেই নিরিক্ষণ করে যাচ্ছিলেন উপমহাদেশের সব জনগণকে। শেষমেশ তার কাছেও মুসলমানদের ব্যপারটা গুরুত্ব পায় বিশেষভাবে। তাই তিনি মুসলমানদের খলিফা মাহদির আগমন, হযরত ঈসা নাবিয়্যিয়ুনা আলাইহিস সালাম—এর অবতরণ, ভারত দারুল হরব হওয়া, সে সম্পর্কে উলামায়ে কিরামের ফতোয়া, বিশেষত জিহাদের ব্যপারে তাদের আকিদা ও লালিত চিন্তাধারার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করেন। তাছাড়া পূর্ববর্তী সব আকিদাও ছিলো এই জিহাদের উপরই। তাই তিনি রিপোর্ট করতে বাধ্য হন যে, “জিহাদ এমন এক মতবাদ, যা মুসলিমদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, কঠোরতা ও জান উৎসর্গ করার ভিত্তি। এ ধরনের সর্বপ্রকার আকিদা সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যবদ্ধরূপে গড়ে তুলতে পারে।”[1] ফলে মুসলমানদের রাজনীত ও অবস্থান কলুষিত হয়ে পড়ে সাদা ভাল্লুকখ্যাত বৃটিশদের কাছে। ভয়ংকররূপেই গণ্য করতে থাকে তারা। এমনকি তাদের শেষ আঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় নিরীহ তাওহিদি জনতা।
অপরদিকে মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানি ১৮৬৮ সালে চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এসেই লেখালেখি ও ধর্মীয় মুনাযারার দিকে দৃষ্টিপাত করে। সে সময় সে লিপিবদ্ধ করে “বারাহিনে আহমাদিয়্যাত’ নামক গ্রন্থ। যে গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চাঁদা কালেকশন করে তার বড় একটা অংশ আত্মসাৎ করে সে। সে গ্রন্থে সে তাঁর কথিত কতক ইলহামেরও সমাবেশ ঘটায়। আত্মভোলা মুসলমানগণ প্রথম তার ধোঁকা বুঝতে না পেরে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। পরেই বেরোতে থাকে থলের বিড়াল। তিনি প্রথম নিজেকে মুজাদ্দিদ,ধর্মীয় সংস্কারক ও আত্মিক পথপ্রদর্শক বলে দাবি করতে থাকে। এবং ১৮৮৯ সালে আচমকা খলিফা মাহদি দাবি করে বাইয়াত নিতে থাকে। সে সঙ্গে মাহদি সম্পর্কে মুসলমানদের আকিদাগুলো পুরোই উল্টে দিয়ে নিজেকে খুনখারাবি ও যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ করে শান্তিকামী বলে প্রচার করতে থাকে। এমনকি তাঁর নাপাক হাতে ইসলাম ও মুসলমানদের বুকে সুঁচালো খঞ্জর বিদ্ধের লক্ষ্যে জিহাদের বিরুদ্ধে অজস্র কিতাব লেখে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে ইংরেজ ইন্টেলিজেন্সদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকে মুসলিম বিশ্বে। আবার তাদেরই ছাত্রছায়ায় তাদের পক্ষ থেকে মিল্লাতে ইসলামিয়ার মধ্যে গোয়েন্দাবৃত্তি করে তাদের সম্ভাবনার স্বাধীন সূর্য উদয়ের নিয়ন আলেয়াও ক্ষীণ করতে থাকে।
বিশেষত মির্জা কাদিয়ানির তখনকার মূল টার্গেট ছিলো মুসলমানদের ভরসার শেষ কেন্দ্রবিন্দু অটোম্যান সম্রাজ্য তথা উসমানিয়া খিলাফতকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। কারণ তারাই ছিলো তখন ইংরেজদের গলার সুঁচালো কাঁটা। যাদের কারণে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংগঠন জায়ানিজামও পারছিলো ফিলিস্তিনকে খুনরাঙা দরিয়ায় পরিণত করে তাদের অভিশপ্ত নাপাক পা দ্বারা বাইতুল মাকদিসকে অশুচি করতে। ফলে তাদের মাথাব্যথা ছিলো আরো বেশি। মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানিই তাদের সে সব উদ্দেশ্য পূরণকে নিজের জন্য ফরয করে নেয় এবং অটোম্যান সম্রাজ্যকে ভেঙে খান খান করে পুরো পৃথিবীতে সাদা ভাল্লুকদের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনে সন্ত্রাসবাদ ইহুদি রাজত্ব কায়েমের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
এই মির্জাই ইহুদি ও খিস্টানদের আঁচলতলে গা ঢাকা দিয়ে ১৮৯৩ সালে নিজেকে মাসিহে মাওউদ বা প্রতিশ্রুত মাসিহ এবং ১৯০১ সালে প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাতামুন্নাবিয়্যিন নামক মহামন্বিত চাদরকে টান দিয়ে কোটি কোটি মুসলমানদের বুকে শানিত ছুড়ি বিদ্ধ করে। ১৯০৮ সালের ২৬ই মে অভিশপ্ত এই নরকীয় কীট পায়খানায় ইহলিলা সাঙ্গ হওয়ার পূর্ব অবধি জারি রেখেছিলো তার এসব প্রদহজনক উপখ্যান। রক্তরাঙানো উপদান।
বাংলাদেশে কাদিয়ানিয়াতের সূচনা ও অবস্থান
আহমাদিয়াতের ওয়েব সাইট মতে ১৯০৫ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার আহমদ কবীর নূর মুহাম্মদ নামক ব্যক্তি সর্বপ্রথম কাদিয়ানি ধর্মমত গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার নাগেরগাঁও গ্রামের রঈস উদ্দিন খাঁন কাদিয়ান গিয়ে কাদিয়ানি হয়। আর ১৯০৯ সালে বগুড়া জেলার মোবারক আলী এ অভিশপ্ত পথে পা বাড়ায়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯১২ সালে ব্রাহ্মণবাড়ির সৈয়দ আবদুল ওয়াহিদের মাধ্যমে এর পূরোপুরি কার্যক্রম চালু হয়। তার মাধ্যমেই সেখানকার কয়েকশত লোক এই কাদিয়ানি ধর্মমত গ্রহণ করে এবং সে স্থানকে তাদের হেডকোয়াটার বানিয়ে বাংলার যমিনকে নাপাক করার পায়তারা শুরু করে।
বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৪২৫ স্থানে ওদের ছোটবড় সমাজ রয়েছে। এমনকি ওদের দাবিমতে পুরো দেশে ওদের ১০৩টি কার্যলয় রয়েছে। যেখান থেকে প্রতিনিয়ত দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলের সাধারণ দরিদ্র পরিবারকে বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগীতা ও ত্রানের মাধ্যমে ঈমানহারা করে পৌঁছে দিচ্ছে জাহান্নামের লেলিহীন অগ্নিশিখায়। ওদের কার্যক্রম এতটাই পরিকল্পিত যে, ওদের ধর্মমতকে সবার দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯২০ সাল থেকে আজ অবধি পাক্ষিক “আহমাদী” নিয়মিতভাবে বের করে আসছে। অথচ আমরা বেখবর। এছাড়া ওদের অঙ্গসংগঠনগুলোর নিজস্ব ম্যাগাজিন ও বুলেটিন রয়েছে। ঢাকাতে রয়েছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এম.টি.এ. বাংলাদেশ স্টুডিও, যা নিয়মিত এম.টি.এ. ইন্টারন্যাশনালের জন্য প্রোগ্রাম তৈরি করে থাকে।
তথ্যসূত্রঃ
[1] ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার, দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, কমরড পল বিশরজ, কলকতা, প্রকাশকাল ১৯৪৫।


Leave a comment