হিজরত শব্দটি মনকোণে উদিত হলেই ত্যাগ ও মহিমার অপার একচিত্র ভেসে উঠে। উদ্ভাসিত হয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে আজমাঈনগণের নির্যাতনের করুন দৃশ্য। হৃদয় উদ্বেলিত তাদের আকাশবাতাস প্রকম্পাণ সে করুন ধ্বনিতে। বিস্ময়েবিমূঢ় হই তাদের দৃঢ়চেতা মনোবল ও শক্ত ঈমানাগ্নির প্রজ্জ্বলনে। যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল কাফির ও মুশরিকদের হৃদয়ে। দুনিয়াতেই জ্বাহান্নামের জ্বলন অনুভব করছিল রওশন ঈমানের চেরাগে। রাসুল ও সাহাবাগণ ত্যাগের নির্যাতনের কষ্ট সহ্য করেও ছিলেন এক অনাবিল প্রশান্তিতে। আর মুশরিক যালিমরা অত্যাচার করেও দগ্ধ হচ্ছিল প্রজ্জ্বলিতে ঈমানাগ্নির দাবানলে। কিন্তু আর কত! কত নির্যাতনের স্টিমরোলারে নিস্পেষিত হওয়া যায়! কত মার খাওয়া যায়! তপ্ত মরুতে শুইয়ে বিরাট পাথরের চাপ সহ্য করা যায়! স্বীয় রক্ত চর্বি দ্বারা জ্বলন্ত কয়লা নিভানো যায়। মক্কার অলিগলিতে শক্ত পাথর ও তপ্ত বালুরাশির বুক চিড়ে টানা হেচড়ার মত নিদারুন কষ্ট ভোগ করা যায়!
আবার ইসলাম অবিনশ্বর। সেখানে চলছে তাকে ধ্বংসের পায়তারা। ঠেকে আছে তার আলো মক্কার অলিগলিতে। তাও নিভিয়ে দেওয়ার অজস্র ষড়যন্ত্রের মুখে। এ আলোতো ছড়াতে হবে বিশ্বের কোণে কোণে। সব মানুষের বদ্ধ দুয়ারে। কিন্তু সেটাই অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে মক্কায় অবস্থান করে; কাফিরদের তোপের মুখে। তাইতো আল্লাহ অনুমতি দিলেন হিজরতের মতো ত্যাগে ভাস্বর এক কষ্টের উপাখ্যানের। তখনই রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উকায মেলা উপলক্ষে মাজান্না বাজারে ও হজের মওসুমে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে গিয়ে বলা শুরু করলেন: ‘আমাকে কে আশ্রয় দিবে? আমাকে কে সাহায্য করবে? যাতে করে আমি আমার প্রতিপালকের দেয়া রিসালতের বাণী পৌঁছে দিতে পারি আর ফলাফল হিসেবে সে জান্নাত পাবে! কিন্তু মদিনাবাসী ছাড়া কেউ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলো না। কারণ সবাই জানত, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্রয় দেওয়া আর পুরো আরব গোত্রগুলোর বিপরীতে যুদ্ধ ডেকে আনা ও তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একই কথা। তাছাড়া কে চায়, নিজের সামান্য বসতভিটায় হাজার হাজার মানুষকে ডেকে এনে অভাবের তাড়নায় পিষ্ট হতে। নিজের খাবার আরেকজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে! তবুও মদিনাবাসী বিশাল হৃদয় নিয়ে কেবল প্রতিশ্রুত জান্নাতের আশায় এ কষ্টগুলো অবনতমস্তকে বরণ করে নিয়েছিলেন। তাদের আশ্রয় দিয়ে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে সহযোগীতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যার উপমা আর দ্বিতীয়টি নেই।
আর যারা স্বীয় মাতৃভূমি ছেড়ে পরিবারপরিজন ও আত্মীয়স্বজনকে নির্যতনের মুখে রেখে শুধু মাত্র দ্বীনের স্বার্থে শতশত মাইল দূরের আরেকটা ভূমিতে নিঃস্ব অবস্থায় চলে গেল, তাদের কি কম কষ্ট! আপনি কি এর সামান্যতম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারবেন? দ্বীনের স্বার্থে আত্মীয় স্বজনকে ছেড়ে কোথাও চিরদিনের জন্য হিজরত করতে পারবেন? তাও আপনার ধর্ম ত্যাগের জন্য সবাইকে কাফিরদের হুমকির মূখে রেখে, কিংবা নিজে আশ্রিত হয়ে সদ্য ইসলামের ছায়াতলে আশ্রিত অন্যান্য সদস্যদের মৃত্যুমুখে ফেলে! জি, মদিনায় হিজরতকারী সমস্ত সাহাবাগণই এই কষ্ট স্বীকার করেছেন। ত্যাগের মহিমা স্থাপনের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। হিজরত নামক এ ত্যাগের ক্ষেত্রে সবাই সমান। হ্যাঁ, তাদের মর্যাদার দিক থেকে কম বেশি হতে পারে, সেটা ভিন্ন বিষয়। এর অর্থ এই নয় যে, কোনো এক নির্দিষ্ট সাহাবি ভক্তি থেকে সমস্ত সাহাবিদের অবদান খাটো করা বা তাদের ত্যাগের কথা উল্লেখই না করা। কিংবা কোনো সাহাবির সঙ্গে বিদ্বেষবশত সবজায়গায় তাঁর অবদান ছোট করে দেখা বা হেয়ভাবে উপস্থাপন করা।
আমরা যদি শিয়াদের দিকে লক্ষ্য করি, তবে এ দৃশ্যই ভেসে উঠে চোখের সামনে। সর্বক্ষেত্রেই তারা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উঠাতে গিয়ে সমস্ত সাহাবাকে ছোট করে উপাস্থাপন করে। আর শাইখাইন তথা আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমাদের অবদান এলে তো কুফুরিমূলক এ ধৃষ্টতা কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়। যেখানেই তাদের কারো আলোচনা আসে সেখানে অতি নিকৃষ্টপন্থায় নিজেদের মিথ্যাচারের ঝুলি খুলে তাদের ঘৃণার বাস্পবাম্প ছড়ায়।
যাকগে, এখন আসল আলোচনা শুরু করি।
সর্বপ্রথম আসি আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত সম্পর্কে। যখন রাতের নির্জনে আওস ও খজরাজের ৭৩ পুরুষ ও দুজন নারী(১) থেকে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাবায় দ্বিতীয়বারের মতো বাইয়াত শেষ করলেন; কা’ব ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: তখন শয়তান এমন জোর আওয়াজে চিৎকার করে উঠল যে, এমন বিকট আওয়াজ আমি কোনোদিনও শুনি নি। সে বলল: হে জাবাজিববাসী! (মিনার বিস্তৃত অঞ্চলকে জাবাজিব বলা হয়) তোমাদের কি খবর আছে যে, নিন্দিত ব্যক্তি ও বেদ্বীনরা মিলে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধর পায়তারা করছে? তখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এ হলো আকবার শয়তান আযব। সে আযীবের পুত্র।(২)
সমস্ত সিরাত গবেষক ও ঐতিহাসিকরা ঘটনা এ পর্যন্তই উল্লেখ করেছেন, এরপর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার যার তাবুতে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সে সঙ্গে তারা এটাও উল্লেখ করেছেন যে, কুরাইশরা পরদিন সকালে আনসারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে তাদের তাবুতে এসেছেন। কিন্তু শিয়াদের তাফসির গ্রন্থে সুরা আনফালের ৩০ নং আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করে, সকালবেলা কুরাইশরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাইয়াতকৃত স্থানে এলো। তখন হামজা ও আমিরুল মুমিনিন আলি আলাইহিস সালাম তরবারি হাতে আকবার সামনে দাড়িয়ে গেলেন। তাদের দুজনকে দেখে কুরাইশরা বলতে লাগল, তোমরা এখানে কেনো একত্রিত হয়েছ? তখন হামজা বলল: আমরা এখনে একত্রিত হয়েছি এক আল্লাহর স্বীকৃতি প্রদান করতে। তোমাদের কারো জন্য এখানে আসা ঠিক হবে না, যদি কেউ আসার চেষ্টা করো তবে আমার তরবারি তার ফয়সালা করবে। তখন তারা এটা বলতে বলতে মক্কায় ফিরে গেল যে, যে আমাদের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করবে, আমরা তাকে নিরাপত্তা দিবো না। যদিও কুরাইশদের নেতৃস্থানীয়দেরও কেউ মুহাম্মাদের দ্বীন গ্রহণ করে। (৩)
সিরাত গবেষক কোনো ঐতিহাসিকই এ ঘটনা উল্লেখ করে নি। আর তারাও এ তথ্য উল্লেখ করেছে সনদহীন। আসল কথা হলো: শিয়ারা যাদের মুহাব্বত করে, তাদের ফযিলত প্রমাণে সুবিধামতো রেওয়ায়েত জাল করে। কিন্তু ফলাফল কোনদিকে যায়, তা ভাবার ফুরসৎ পায় না। ছোট্ট একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। শিয়াদের হুজ্জাতুল ইসলামখ্যাত নাজমুল হাসান কারারবি ‘চৌদায়ে সিতারা’—নামক গ্রন্থের ৬৭ নাম্বর পৃষ্ঠায় ওহুদ যুদ্ধ অধ্যায়ে লেখে যে, এই যুদ্ধে কাফির বাহিনীর কেবল ৩০ জন হত্যা হয়, যার মধ্যে বারোজন আলি আলাইহিস সালাম হত্যা করেছিল। আর এ বইয়েরই ৪২ পৃষ্টায় হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে ৩১ জন হত্যা করার পর তাঁর পা পিছলে যমিনে পড়ে গিয়েছিল। তখন ওয়াহশি নামক এক গোলাম সুযোগ বুঝে বর্শা মেরে তাকে হত্যা করে দিয়েছিল। হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু পা পিছলে যমিনে পড়ে গিয়েছিল কিনা, সেটা ভিন্নকোনো প্রবন্ধে উল্লেখ করব। কিন্তু আপাতত আমাকে আপনারা ঐতিহাসিক এ হিসাবটা একটু মিলিয়ে দিন। তাছাড়া আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু আনহুর অবদান যাবে কোথায়! যাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ তরবারি দিয়েছিলেন তার হক আদায় করতে। যার হক ছিল কাফিরদের মেরে তা বাঁকা করা!
এরপর আসি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকতৃক হিজরতের রাতে গারে ছাওরে যাওয়ার বর্ণনায়। পূর্বেই বলে রাখি যে, এটা অনিস্বীকার্য যে, হিজরতের রাতে আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানায় ঘুমানো বড় এক ত্যাগ ও সাহসীকতার পরিচয়। যাকে ছোট চোখে দেখক কখনো পূর্ণ ঈমানদার হতে পারে না। আর যদি বিদ্বেষবশত কিংবা কোনো দলকে দাবানোর লক্ষ্যে কেউ এটাকে তুচ্ছভাবে উল্লেখ করতে যায়, আমি তার ঈমান নিয়েই সন্দেহ করি। কিন্তু সে ভয়ংকর রাতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর রাসুলের সঙ্গে থাকা আরো বড় বিপদ ও ত্যাগের ছিল। এমনকি তার পরিবারের জন্যও ছিল বড় হুমকির। কারণ, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন কাফিররা ঘরে না পাবে, তখন এমনিতেই সন্দেহের তীর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দিকেই যাবে। কারণ তিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু ও সর্বদার সঙ্গী। তাইতো ঘরে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে শায়িত দেখে সবাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর গৃহেই ছুটে গিয়েছিল। হযরত আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: এদের মধ্যে আবুল জাহালও ছিল। তারা জিজ্ঞেস করল: আবু বকর তনয়া! তোমার বাবা কোথায়? আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন: আল্লাহর শপথ! আমার বাবা কোথায় আছে আমার জানা নেই। এ কথা শুনতেই আবু জাহাল -যে ছিল খবিছ ও বজ্জাত- হাত উঠিয়ে সজরে আমার মুখে এমন এক চপেটাঘাট করে যে, তাতে আমার কানের দুল পড়ে যায়।(৪)
কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, শিয়াদের কোনো কিতাবেই হিজরতের ঘটনায় অন্যকোনো সাহাবির আত্মত্যাগ কিংবা নির্যাতন ও কষ্ট স্বীকারের কথার উল্লেখ নেই। বরং বড় অক্ষরে শুধু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকতৃক রাসুলে কবারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে থাকাকেই প্রচার করেছে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যদি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে না থাকতেন, হয়তো হিজরত উপলক্ষ্যে কোনোদিন তাঁর নামও উল্লেখ হতো না। মূলকথা হলো এখানেও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম উল্লেখ করেছে তাদের গাত্রদাহ থেকেই। তাদের বিদ্বেষ ও ঘৃণার দাবানল থেকেই। এটা বুঝাতে আমি তাদের কয়েকটা কিতাবের উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি। আশাকরি তাতে তাদের বুদ্ধিপ্রতিবন্দ্বী ও জ্ঞানপাপী হওয়ার কিছুটা হলেও প্রমাণ মিলবে।
১. ‘কাশফুল গুম্মাহ ফি মা’রিফাতিল আইম্মাহ’ গ্রন্থে –শুজায়াতু আমিরিল মু’মিনিনা আলাইহিস সালাম– বা আমিরুল মু’মিনিন (আলি) আলাইহিস সালামের বীরত্ব’ অধ্যায়ে সনদহীনভাবে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন: আলি আলাইহিস সালাম স্বীয় আত্মাকে বিক্রি করে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাদর গায়ে যখন ঘুমিয়ে পড়লেন, তখন আবু বকর আসল। সে ধারনা করেছিল যে এখানে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোয়া। তখন তিনি (আলি) তাকে বললেন: আল্লাহর নবি বীরে মাইমুনের দিকে চলে গেছেন, সেখানে গেলে তাকে পেতে পারেন। তখন আবু বকর সেখানে গেলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে গুহায় প্রবেশ করলেন।(৫)
২. ‘চৌদাহে সিতার’ গ্রন্থে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরত অধ্যায়ে লেখে, “মোটকথা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওনা হতেই আবু বকর তার পেছনে চলল। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের আঁধারে কোনো শত্রু পিছু নিয়েছে ভেবে দ্রুত চলা শুরু করলেন এবং পায়ে হোঁচট খেয়ে রক্ত গড়ানো আরম্ভ হলো। অতঃপর বুঝতে পারলেন যে, ইবনে কুহাফা আসছে তাই দাঁড়ালেন। সহিহ বুখারির ১ম খণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়ের ৬৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে যে, রাসুলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর ইবনু আবি কুহাফা থেকে মূল্যর বিনিময় উট ক্রয় করেছেন। আর মাদারিজুন নবুওয়াতে রয়েছে যে, আবু বকর দুইশো দিরহাম দিয়ে ক্রয়কৃত উট রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নয়শ দিরহামে বিক্রি করেছে।”(৬)
৩. দার রাহে হাক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)’ গ্রন্থের পিডিএফ সংস্করণে লেখে: “রাসূল (সা.) সূরা ইয়াসীন পাঠ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে ভিন্ন পথে মক্কার বাইরে সাউর গুহায় যান। হযরত আবু বকরও (রা.) জানতে পেরে রাসূল (সা.) –এর সাথে গেল।”(৭)
৪. শিয়াদের গ্রহণযোগ্য দুটো তাফসিরের কিতাব ‘তাফসিরুল কুম্মি ও আল বুরহান ফি তাফসিরিল কুরআন’ উভয় গ্রন্থেই একই তাফসীর বিদ্যমান। সেখানে বর্ণিত দীর্ঘ ঘটনা থেকে আমি মূল উদ্দেশ্যটা উদ্ধৃত করব:রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য বিছানা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আলি ইবনে আবু তালিব আলাইহিস সালামকে বললেন: তোমার নফস কি আমার জন্য উৎসর্গ করবে? তিনি বললেন হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি আমার বিছানায় ঘুমাও ও আমার চাদর মুড়ি দাও। আলি আলাইহিস সালাম তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানায় ঘুমালেন এবং তাঁর চাদর মুড়ি দিলেন। অতঃপর জিবরিল আলাইহিস সালাম এসে রাসুলের হাত ধরে কুরাইশদের ঘেরাও থেকে বের করলেন, তখন তিনি “وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ” পড়তে ছিলেন। এরপর জিবরিল তাকে বললেন: আপনি সাওর পাহাড়ের পথ ধরুন।……… আবু বকর রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করলেন অতঃপর তিনি তাকে সঙ্গে নিলেন। তখন আবু কুরয বলল: এই পথে আবু কুহাফার ছেলে অগ্রসর হয়েছে। এরপর বলল: আবু কুহাফার ছেলে এ পথই মাড়িয়ে গিয়েছে। যেটা (পদচিহ্ন) তাদের গুহার মুখ পর্যন্ত অবগত করিয়ে দেয়।”(৮)
পাঠক! এখানে মোটামুটি চারটা উদ্বৃতি উল্লেখ করলাম। যেখানে উল্লেখিত ইতিহাস পরস্পর বিরোধী হলেও সবার উদ্দেশ্যই এক। তা হলো আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হেয় করা। আল্লাহ তায়ালা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুরআনে যে তাকে রাসুলের ঘনিষ্ট সঙ্গীর মর্যাদা দিয়েছেন, সে সহচর্যকে তুচ্ছভাবে উপস্থাপন করা। বরং প্রত্যেকেই তারিখুত তবারির সনদহীন বিচ্ছিন্ন রেওয়ায়েত উল্লেখের দ্বারা অতিনিকৃষ্টপন্থায় তাদের হৃদয়ের বিদ্বেষ ও বিষ উগড়ে দিয়েছে। যেগুলো তাদের (শিয়াদের) রাবিদের থেকেই জালকৃত। যদিও তারা কোনোটারই হাওয়ালা উল্লেখ করি নি, তবুও আমি মূলগ্রন্থেই আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি।
ইবনু জারির তবারি রহিমাহুল্লাহ তারিখুত তবারি —এর মধ্যে হিজরতের পূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন:
وقد زعم بعضهم أن أبابكر أتى عليا فسأله عن نبي الله صلى الله عليه وسلم فأخبره أنه لحق بالغار من ثور…..
তাদের কেউ ধারনা করে যে, আবু বকর আলির কাছে এসে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা জিজ্ঞেস করলেন। তিনি জানালেন যে, তিনি গারে সাওরের দিকে গিয়েছেন। অতঃপর বললেন: আপনার যদি সেখানে কোনো প্রয়োজন থাকে, তবে তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে পারেন। তখন আবু বকর খুব দ্রুত বের হলো এবং রাস্তায় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে গেল। রাসুল রাতের অন্ধকারে আবু বকরের আওয়াজ পেয়ে কোনো মুশরিক আসছে ভেবে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। তখন তাঁর জুতার অগ্রভাগ ছিড়ে পাথরের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে খুব রক্ত গড়াতে লাগল। এবং আরো দ্রুত চলতে লাগলেন। তখন আবু বকরের রাসুলের কষ্ট হওয়ার ভয় হলো তাই উঁচু আওয়াযে কথা বলতে লাগল। তখন রাসুল তাঁকে চিনে তার জন্য দাঁড়ালেন। সে আসলো এবং উভয়েই চলা শুরু করল অথচ রাসুলের পা অধিক রক্তের ক্ষরণে খাঁজযুক্ত হয়ে গেল। এভাবেই সকাল পর্যন্ত তারা গুহায় পৌঁছে গেল। তারা উভয়ে সেখানে প্রবেশ করল। আর যে দল রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহ ঘিরে ছিল, সকালবেলা তারা ঘরে প্রবেশ করল। তখন আলি আলাইহিস সালাম বিছানা থেকে দাঁড়ালেন। তারা যখন তাঁর নিকটবর্তী হলো, তাকে চিনতে পারল। এবং জিজেচ্ঞস করল যে, তোমার সাথী কোথায়? বললেন আমি জানি না অথবা তার প্রতিপালকের হেফাজতে। তারা তখন তাঁকে ঘর থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দিলো। ফলে তিনি বেরোলেন। তখন তারা তাঁকে ভর্ৎসনা করল এবং মারধর করল। অতঃপর তাঁকে মসজিদের দিকে নিয়ে গেল এবং কিছুক্ষণ আটকে রেখে ছেড়ে দিলো। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে ওদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি দিলেন।(৯)
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে কয়েকটা অসামঞ্জস্যতা বের হয়। যার দ্বারা এ ঘটনা বানোয়াট হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়।
১. সনদহীন বর্ণনা। যেটা কারো ধারনা বলে উল্লেখ করা। শেষদিকে ‘وقام علي عليه السلام عن فراشه’ তথা ‘আলি আলাইহিস সালাম তাঁর বিছানা থেকে দাঁড়ালেন’—এর উল্লেখ দ্বারা সে ধারণাকারী শিয়া বলে স্পষ্ট হওয়া।
২. আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকতৃক অস্ত্রেসস্ত্রে সজ্জিত শত্রু বেষ্টিত ঘরে এসে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা।
৩. আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মুশরিক ধারনা করে রাসুলের পায়ে হোঁচট খেয়ে রক্ত বের হওয়া। অর্থাৎ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য রাসুলের কষ্টকে সাব্যস্ত করা এবং সুযোগে মুশরিক বলার মতো কুফুরি প্রকাশ করা।
৪. শত্রুদের শ্রবণের সমস্ত ভয় উপেক্ষা করে রাতের নীরবতা ভেদ করে আবু বকরের উঁচু আওয়াজে রাসুলকে ডাকা।
৫. আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর বীরত্ব ও সাহসিকতার এক অনন্যগুনকে কালিমাযুক্ত করে তাঁর জন্য কাফিরদের নির্দেশে ঘর থেকে বের হওয়া, মার খাওয়া ও আটক হওয়াকে সাব্যস্ত করা।
৬. সমস্ত সিরাত গবেষক ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনার বিপরীতে বিচ্ছন্ন ও একক রেওয়ায়েত হওয়া।
পাঠক! এতগুলো অসামঞ্জস্যতামূলক বর্ণনায়ই ওদের মূল ভিত্তি। এরসঙ্গেই এদিক ওদিক বানিয়ে নিজমতো সাজিয়ে কাহিনি বর্ণনা করাতো নিত্যদিনের অভ্যাস। কিছু কিছু কিতাবে তো তারিখে তবারিতে রয়েছে বা অন্যকোনো হাওয়ালা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত করে আর কিছু কিতাবে হাওয়ালা উল্লেখ না করেই ওমন জালকৃত কোনো বর্ণনাকে পুজি করে মনমতো নিজেও একটা বানিয়ে ফেলে। ফলে দেখা যায় এক কিতাবের বর্ণনার সঙ্গে অন্য কিতাবের মিল না থাকলেও মূল উদ্দেশ্য তথা সাহাবা বিদ্বেষের দিক থেকে সবাই একমত থাকে। যারা তারিখে তবারির এই বর্ণনাকেই মূল ভিত্তি বানায়, তাদের সাম্প্রদায়িকতা ও পক্ষপাতিত্বের এমন নিম্ম মানোসিকতার কারণেই বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত এর পরবর্তী বর্ণনাটাই চোখে পড়ে না। যে সনদে রয়েছে আলি ইবনু নসর আল-জাহযামি, আবদুস সামাদ ইবনু আবদিল ওয়ারিছ, আবদুল ওয়ারিছ ইবনু আবদিস সামাদ ইবনি আবদিল ওয়ারিছ, তার পিতা আবদুস সামাদ, হিশাম ইবনু উরওয়া ও উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর রহিমাহুমুল্লাহগণ। এ রেওয়ায়েতেই রয়েছে যে, সাহাবাগণ হিজরত শুরু করলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলেন, তখন আল্লাহর রাসুল তাকে এ বলে আটকে রাখলেন ‘তুমি অপেক্ষষা করো। আমি জানি না, হয়তো আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেওয়া হবে। অতঃপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সফরের প্রস্তুতি হিসেবে দুটো উট ক্রয় করেন।(১০) এবং এরই ৬ পৃষ্ঠা আগে বর্ণিত হয়েছে যে,
وكان ابو بكر كثيرا ما يستأذن رسول الله صلى الله عليه وسلم في الهجرة، فيقول له رسول الله صلى الله عليه وسلم لاتعجل لعل لله يجعل لك صاحبا
আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রায়ই রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হিজরতের অনুমতি প্রার্থনা করতেন। জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন: তড়িঘড়ি করো না, হয়ত আল্লাহ তোমার জন্য একজন সঙ্গী জুটাবেন।(১১) একই বর্ণনা সিরাতু ইবনি হিশাম ও আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার মধ্যেও রয়েছে।(১২)
এরদ্বারা বুঝা গেল আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এমনিতেই হিজরত না করে মক্কায় থেকে যান নি, বরং রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তাকে সফরসাঙ্গী বানানোর জন্য রেখে দিয়েছেন।
এখন আসি পরবর্তী অধ্যায়ে যে, কিভাবে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হিজরত করেছেন। যদিও এটা আমার উল্লেখ করার প্রয়োজন পড়ে না। কেননা মুসলমানমাত্রই এ ঘটনা আমরা জেনে থাকি। তারপরও রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মুহাব্বত ও ঘনিষ্ঠতা বুঝানোর লোভ সামলাতে পারছি না। হুবাহু ইবারতের অর্থ উল্লেখ করলে হয়ত লেখা বড় হয়ে যেতে পারে। তাই সিরাত ও ইতিহাসগ্রন্থের বিভিন্ন রেওয়ায়েতের সমন্বয়ে তার সারমর্ম তুলে ধরছি। হযরত আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন সকালে কিংবা বিকালে আমাদের ঘরে আসতে ভুল করতেন না। কিন্তু হিজরতের দিন দুপুরেই আমাদের গৃহে আসেন। সাধারণত এ সময় তিনি কখনো আসতেন না। তাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: নিশ্চয় কোনো ঘটনা ঘটেছে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু খাট থেকে সরে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লামকে বসতে দিলেন। তিনি বসেই বললেন: তোমার কাছ থেকে অন্যদের বের করে দাও। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ, তারা উভয়েই তো আমার মেয়ে। ব্যাপার কি? রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আল্লাহ তাআলা মক্কা থেকে হিজরতের অনুমতি দিয়েছেন। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ আপনার সহচর্য পাবো তো? তিনি বললেন: হ্যাঁ, পাবে। এটা শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আনন্দে কেঁদে ফেলেন। আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: আল্লাহর কসম! আনন্দে যে মানুষ কাঁদতে পারে, এর আগে আমি এটা কখনো বুঝি নি। তখন তারা উভয়েই আবদুল্লাহ ইবনে আরকিতকে পারিশ্রমিকের বিনিময় পথপ্রদর্শক হিসেবে নিযুক্ত করেন।
রাতে যখন কুরাইশরা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহ বেষ্টন করে নেন, তখন তিনি মানুষের আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে হযরত আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে স্বীয় বিছানায় রেখে তিনি একমুঠো মাটি নিক্ষেপ করে সুরা ইয়াসীন তিলাওয়াত করতে করতে তাদের বেষ্টনি থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর গৃহে যান ও সে ঘরের পেছন থেকে জানালা দিয়ে মক্কার নিম্মপথ সাওর গুহার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান।
আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু আগেই তাঁর ছেলে আবদুল্লাহকে মক্কার লোকেরা কখন কি বলে তা জানাতে বলেছিলেন। তাই প্রতিরাতে তিনি তাদের কাছে খবর সরবরাহ করতেন। আর তাঁর আযাদকৃত গোলাম আমির ইবনু ফুহাইরাকে দিনের বেলা মেষ চড়িয়ে সন্ধায় তাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাই তিনি দিনে মক্কার রাখালদের সঙ্গে মেষ চড়াতেন আর সন্ধ্যেবেলা গুহায় নিয়ে যেতেন। এবং দুধ দহন করে মেষ যবেহ করে আহারের ব্যবস্থা করতেন। ভোরে আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর তাদের কাছ থেকে মক্কায় এলে তাঁর পেছনে পেছনে এসে পদচিহ্ন মুছে ফেলতেন। হযরত আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহাও সন্ধায় তাদের জন্য খাবার নিয়ে যেতন।(১৩)
পাঠক! হিজরতের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত ঘটনা এই। এবং এই বর্ণনাগুলো দুই একটা সনদে বর্ণিত হয় নি বরং অনেক সনদে এসেছে। শুধু তাই নয়, বরং সমস্ত ইতিহাস ও সিরাতের কিতাবে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন, তার পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে কুরাইশরা গুহা পর্যন্ত গেছে, বা তিনি রাসুলের পিছু নিয়েছেন আর রাসুল তাকে মুশরিক ভেবে জোরে চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে রক্ত বের হয়েছে, কিংবা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে জিজ্ঞেস করে রাসুলের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছেন; এগুলো সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
ইবনে জারির তবারি রহিমাহুল্লাহ তারিখুত তবারির ২/৩৭২ পৃষ্ঠায় কুরাইশদের দারুন নদওয়ার মশওয়ারা ও রাসুলের হিজরত সম্পর্কে বিশুদ্ধ সনদে মূল ঘটনা উল্লেখ করে মাঝে সনদহীনভাবে লেখেন: আবু জাফর বলেনে: কেউ কেউ এ ঘটনার সঙ্গে এটা অতিরিক্ত উল্লেখ করে যে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি রাদিয়াল্লাহু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, যদি কুহাফার ছেলে তোমার কাছে আসে তবে তাকে জানিয়ে দিও যে আমি সাওর পাহাড়ের দিকে গিয়েছি। সুতরাং তুমি তাকে আমার সাথে মিলিত হতে বলবে আর আমার জন্য খাবার পাঠাবে। আমার জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময় একজন পথপ্রদর্শক ঠিক করবে, যে আমাকে মদিনায় নিয়ে যাবে। আর আমার জন্য সাওয়ারি কিনবে…।
আমার ধারণা, তারিখুত তবরারির সূত্রে আমার লেখিত প্রথম বর্ণনা; যা আমি শিয়াদেরকতৃক জালকৃত বলে প্রমাণ করেছি—এবং এটা; এ দু’ বর্ণনাই শিয়াদের হিজরত ইতিহাসের মূলভিত্তি। প্রথম বর্ণনাটি জাল হওয়া নিয়ে তো সন্দেহ থাকার কথা না। কেননা আমার ক্ষুদ্র অধ্যায়নে ওই রেওয়ায়েতের ব্যপারে কোনো ইতিহাসবিদের সামান্য মতামতও পাই নি। মূল সনদের সাথেও ইতিহাসটি জানতে পারি নি। তবে এর বর্ণনাকারী যে একজন শিয়া, সেটা স্পষ্ট। যা আমি যথাস্থতানেই দেখিয়ে এসেছি। আর দ্বিতীয় বর্ণনার ক্ষেত্রে ইবনে কাছির রহিমাহুল্লাহ মন্তব্য করেন যে, “وقد حكى ابن جرير عن بعضهم……. وهذا غريب جدا وخلاف المشهور من أنهما خرجا معا” ইবনু জারির যে কতক থেকে বর্ণনা করেন……এটার সনদ নিতান্তই গরিব। শুধু গরিব নয় বরং প্রসিদ্ধ বর্ণনার বিপরীত। আর প্রসিদ্ধ বর্ণনা হলো তারা দুজন এক সঙ্গে বের হয়েছিলেন।(১৪)
যাকগে, এবার আসি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উট বিক্রি সম্পর্কে। এ সম্পর্কে নাজমুল হাসান কারারবি চৌদায়ে সিতারার মধ্যে লেখে, মাদারিজুন নবুওয়াতে রয়েছে যে, আবু বকর দুইশো দিরহাম দিয়ে ক্রয়কৃত উট রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নয়শ দিরহামে বিক্রি করেছে।”(১৫)
এই লেখাটাই তাকে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপর বিদ্বেষের চূরান্ত সীমায় পৌঁছে দেয়। এবং তার অন্তরে থাকা ঘৃণার বিষকে সুস্পষ্টভাবে উগড়ে দেওয়া বুঝায়। এটা বুঝতে হলে আমাদের মাদারিজুন নবুওয়্যাহ গ্রন্থেই চলে যেতে হবে। আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ লেখেন:
হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লিাহু আনহু চারশ দিরহাম দিয়ে দুটো উট কিনেছিলেন। অন্য রেওয়ায়েতে রয়েছে আটশ দিরহাম দিয়ে ক্রয় করেছিলেন। এবং চারমাস তার পরিচর্যা করে মোটাতাজা করেছেন। তিনি দুটো উটের যেকোনো একটি গ্রহণের জন্য রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত করলেন। কিন্তু রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা এ শর্তে গ্রহণ করলেন যে, তাকে তার মূল্য গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নয় শ দিরহাম দ্বারা তা ক্রয় করে নিলেন।(১৬)
আসুন আমরা আগে দেখি নিই যে, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইচ্ছে করেই উট বিক্রি করেছিলেন না রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তা ক্রয় করেছেন। প্রথমত এটা জানা প্রয়োজন যে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হিজরতের কথা বলেছিলেন, তখনই তিনি দুটো উট ক্রয় করেছিলেন এবং চারমাস বাবলা গাছের পাতা খাইয়ে মোটাতাজা করেছিলেন।(১৭) হিজরতের সময় তিনি এ দুটোর মধ্যে উত্তমটাকে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার উপর কুরবান হোক। আপনি এটা গ্রহণ করুন। তখন তিনি বললেন: যে উট আমার নয়, তাতে আমি আরোহণ করতে পারি না। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। এ উট আপনারই। তিনি বললেন, এটা হতে পারে না; তুমি কত মূল্যে তা ক্রয় করেছ? তিনি বললেন এত এত মূল্যে। তখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি ওই মূল্যের বিনিময়ই তা গ্রহণ করলাম।(১৮)
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে তবরানির বর্ণনা রয়েছে, আবু বকর! তুমি যে মূল্যে ক্রয় করেছ, ওই মূল্যই কি দিবো? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: যদি আপনি চান।(১৯)
ওয়াকিদি বলেন যে, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু উটদুটো ৮০০ দিরহাম দিয়ে ক্রয় করেন।(২০)
উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা দুটো বিষয় স্পষ্ট হলো: ১. আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকতৃক উট বিক্রি না করা। ২. ক্রয়কৃত দামে বিক্রি করা। যদিও মাদারিজুন নবুওয়্যাহ গ্রন্থকারের ৯০০ দিরহাম লিখার কারণে দ্বিতীয় বিষয়টি মতভেদপূর্ণ হয়ে গেছে। তবুও প্রথম বিষষয়টি তো সুস্পষ্ট। কিন্তু চৌদায়ে সিতারা প্রণেতা যে তথ্য জালিয়াতি করল, এটা কি তার বিদ্বেষ প্রমাণ করে না? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হেয়ভাবে উপাস্থাপনের মত কুফুরি করল না? শত্রুতা প্রকাশের এ মিছিলে সে কী একাই শামিল হবে না ইরান ও পাকিস্তানের সর্বচ্চ শিয়াধর্মীয় ছয় নেতা, যারা এ গ্রন্থের উচ্চাসিত প্রশংসা করে বাণী দিয়েছে, তারাও অন্তর্ভূক্ত হবে? যাদের প্রত্যেকেই তাদের সর্বচ্চ লকব আয়াতুল্লাহ, আয়াতুল উজমা, মুজতাহিদে আজম, সিকাতুল ইসলাম ও হুজ্জাতুল ইসলামের মত মহানসব উপাধিধারী! অথচ এই হলো তাদের ইনসাফের অবস্থা? এরপরও কী তারা কোনো ধর্মের সম্মানের স্থানে থাকতে পারে? ধর্মীয় উচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত থতাকতে পারে? যে ধর্মের সর্বচ্চ ধর্মীয় নেতাদের ইনসাফের এই অবস্থা, তাদের সাধারণদের অবস্থা কী হতে পারে! সাহাবা বিদ্বেষের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কীরূপ হতে পারে? তারা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উট বিক্রিই দেখল, অথচ তিনিই এ হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘরের সমুদয় অর্থ; যার পরিমাণ ৬ হাজার দিরহাম, তার পুরোটাই যে নিয়ে গিয়িছিলেন, সেটা কি একবার দেখলেন না? এ ইতিহাসের দিকে একবার নজর পড়ল না আপনাদের?(২১)
যাকগে, এতক্ষণ তো মিথ্যাচার ও বিদ্বেষ সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পেলেন। শেষমেশ এমনই আরেকটা মিথ্যাচার ও বিদ্বেষমূলক উক্তি দিয়ে আমার লেখা শেষ করেছি। গারে সাওরের পর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনার যাত্রাপথ সম্পর্কে শিয়াদের কিতাবে তেমন বর্ণনা নেই বরং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন সনদে বিভিন্নভাবে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানায় থাকাকেই উল্লেখ করেছে। যেন হিজরতের তুলনায় এ ঘটনাই মূখ্য। আর এরপরই শুরু তাঁর হিজরত ও কুবা গমন নিয়ে বিভিন্ন রেওয়ায়েত। সেগুলো সব জমা করে উল্লেখ করতে গেলে বড় কোনো গ্রন্থে রূপ নিবে। আর এ প্রবন্ধে ওসব উল্লেখ করাও উদ্দেশ্য না। যাইহোক, তাদের বিদ্বেষমূলক সে উক্তিটা দেখুন, যেটা বিহারুল আনওয়ার—১৯/১১৬ —এর সূত্রে দার রাহে হাক প্রকাশনী কতৃক বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) নামক গ্রন্থে এনেছে: হযরত আবু বকর মহনবীকে পীড়াপীড়ি করতে থাকে যে চলুন মদিনায় চলে যাই। কিন্তু রাসুল (সা.) তা গ্রহণ না করে তাকে বললেন: আলী তাঁর জীবন বাজী রেখে আমাকে রক্ষা করেছে এবং সে আহলে বাইতের সর্বোত্তম ও চাচাত ভাই। আলী এখানে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ব না। (২২)
পাঠক! পূর্বেই যেহেতু এদের মিথ্যাচার ও বিদ্বেষের একটা নমুনা দেখেছেন, তাই এই উক্তির স্বরূপ বুঝতে আশাকরি কোনো অসুবিধে হবে না। শুধু এতটুকুনই বলি যে, কোনো ঐতিহাসিক কিংবা সিরাত গবেষক এমন কোনো তথ্য উল্লেখ করে নি।
সুত্র:
১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৬০,
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৬৪, সিরাতু ইবনি হিশাম—১/৪৪৭
৩. তাফসিরে কুম্মি—১/২৭৩, মুয়াসসাসাতু দারিল কিতাব লিত-তবায়াতি ওয়ান-নাশর, কুম, ইরান; আল বুরহান ফি তাফসিরিল কুরআন—৩/২৯৯, মুয়াসসাসাতু আ’লামিল মাতবুয়াত, ২য় প্রকাশ, ১৪২৮ হিজরি, ২০০৬ ঈসায়ি, বাইরুত, লেবানন,
৪. সিরাতু ইবনি হিশাম—১/৪৮৭, তারিখুত তবারি—২/৩৭৯-৮০, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৭৯, তারিখুল ইসলাম লিয-যাহাবি—২/৩২৭ আসসিরাতুন নববিয়্যাহ।
৫. কাশফুল গুম্মাহ ফি মারিফাতিল আইম্মাহ—১/৩৪৩, মারকাযুত তবায়া’ ওয়ান নাশর লিল মাজমায়িল আলামি লি আহলিল বাইতি আলাইহি ওয়াসাল্লাম, প্রকাশকাল. ১৪৩৩ হিজরি, ২০১২ ঈসায়ি।
৬. চৌদাহে সিতারা—৬২
৭. ‘বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)—৭৭,দার রাহে হাক প্রকাশনী
৮. তাফসিরে কুম্মি—১/২৭৬, মুয়াসসাসাতু দারিল কিতাব লিত-তবায়াতি ওয়ান-নাশর, কুম, ইরান; আল বুরহান ফি তাফসিরিল কুরআন—৩/৩০১, মুয়াসসাসাতু আ’লামিল মাতবুয়াত, ২য় প্রকাশ, ১৪২৮ হিজরি, ২০০৬ ঈসায়ি, বাইরুত, লেবানন।
৯. তারিখুত তবারি—২/৩৭৪
১০. তারিখুত তবারি—২/৩৭৫
১১. তারিখুত তবারি—২/৩৬৯
১২. সিরাতু ইবনি হিশাম—১/৪৮০, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৭৭
১৩. সিরাতু ইবনি হিশাম—১/৪৮৪.., তারিখুত তবারি—২/৩৭৭.., আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৭৮.., দালায়িলুন নবুওয়াহ—২/৪৭৩, তারিখু ইবনি খালদুন—২/৪২০
১৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৭৯
১৫. চৌদাহে সিতারা—৬২
১৬. মাদারিজুন নবুওয়্যাহ—২/৮৬
১৭. সহিহুল বুখারি—হা. নং—২২৯৭, দালায়েলুন নবুওয়্যাহ—২/৪৭৩, তারিখুল ইসলাম লিয-যাহাবি—২/৩২০, আসসিরাতুন নববিয়্যাহ।
১৮. সিরাতে ইবনু হিশাম—১/৪৮৬-৮৭, তারিখুত তবারি—২/৩৭৯, তারিখুল ইসলাম—২/৩২০ আসসিরাতুন নববিয়্যাহ।
১৯. দালায়িলুন নবুওয়্যাহ (হাশিয়া)—২/৪৭৪
২০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৭৭, দালায়িলুন নবুওয়্যাহ (হাশিয়া)—২/৪৭৪
২১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া—৩/১৭৯
২২. ‘বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)—৭৭,দার রাহে হাক প্রকাশনী


Leave a comment