শিয়া; পরিচয়

শিয়া; পরিচয়

শিয়া (الشيعة) শব্দটি একবচন। অর্থ দল বা অনুসারী। ইবনে মানজুর (মৃ: ৭১১ হি.) বলেন: শিয়া বলা হয় ব্যক্তির অনুসারী ও সাহায্যকারীকে। এর বহুবচন شِيَعٌ আর বহুবচনের বহুবচন: أشياع । মূলত শিয়া একটি দলকে বলা হয়। এর একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন, দ্বিগুন বহুবচন, পু.লিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে এ নাম তাদের ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে, যারা আলি রাদি. ও আহলে বাইতকে শাসক ও ক্ষমতাশীল মনে করে। এমনকি এ নাম তাদের বিশেষণে পরিণত হয়। এজন্যই যখন বলা হয়: অমুক ব্যক্তি শিয়া, তখন বুঝে নেয় যে, সে তাদেরই একজন।  

পরিভাষায় শিয়া তাদেরই বলা হয়, যারা হজরত আলি রাদি. শানে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে এবং হজরত আবু বকর ও উমর রাদি.-দের শানে অযাচিত কথা বলে। সঙ্গে সঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর যেসব সাহাবি আলি রাদি. এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন নি কিংবা পরবর্তী উম্মাহর মধ্য থেকে যারা আলি রাদি.-কে রাসুলের পরবর্তী খলিফা হিসেবে বিশ্বাস করে না, (বরং চতুর্থ খলিফা বলে থাকে) তাদের কাফের বলে।[1]

শাহরাস্তানি বলেন: শিয়া তারাই, যারা আলি রাদি. এর ইমামত ও খেলাফত দলিল ও রাসুলের অছিয়ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মনে করে এবং এই বিশ্বাস রাখে যে, এই ইমামত তার সন্তানদের মধ্যে থাকবে। তারা ব্যতীত যদি অন্য কেউ খলিফা বা শাসক হয়, তবে জালেম সাব্যস্ত হবে আর যদি তারা (কথিত ইমামগণ) সে শাসন মেনে নেন, তবে তাকিয়া বা ধর্মমত গোপন করে উপরে উপরে মেনে নেওয়া হবে।[2]

শিয়াদের যবানে শিয়া সংজ্ঞা

শিয়াদের অন্যতম গ্রহণযোগ্য আলেম সা’দ ইবনে আবদুল্লাহ আল কুম্মি[3] (মৃ. ৩০১ হি.) বলেন: শিয়া আলি ইবনে আবু তালেবের দল।[4] আরেক স্থানে লেখেন: শিয়া হলো আলি ইবনে আবু তালেবের দল। যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এ নামে পরিচিত হয়েছিল আর তাঁর ইন্তেকালের পরে সবার থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে এবং আলি রাদি. এর ইমামতের কথা বলে।[5] নাওবাখতিও[6] একই সংজ্ঞা বলেছেন।[7]

শায়েখ মুফিদ[8] বলেন: শিয়া—….আমিরুল মুমিনিন আলি আলাইহিস সালামের অনুসারীগণ; যারা তার প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে লেগে আছে। এবং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর কোনো ব্যবধান ছাড়া তার ইমামতকে বিশ্বাস করে, সে সঙ্গে তার পূর্ববর্তীদের খেলাফত অস্বীকার করে। অর্থাৎ তারা বিশ্বাসগতভাবে অন্যকারো অনুসারি হয় না বরং আলি রাদি.-কেই আদর্শ মানে এবং তারই অনুসরণ করে।[9] সামনে লেখে: এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে ইমামিয়া (ফিরকার সমস্ত শাখা) এবং জায়েদি ফিরকার জারুদিয়া শাখা অন্তর্ভূক্ত হবে। …জায়েদি ফিরকার অন্যকোনো শাখা দল শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত নয়।[10]

শিয়াদের বিশ্বাস একদিকে রেখে শায়েখ মুফিদের এ সংজ্ঞার দিকে লক্ষ করলে তা অসম্পূর্ণ দৃষ্টিগোচর হয়। অবশ্য শায়েখ তুসি[11]-এর লেখা দ্বারা এ সংজ্ঞার এমন পূর্ণতা দেওয়া যায়, যার উপর উপর শিয়াবাদের ভিত্তি। কেননা তিনি শিয়াদের গুনাবলী উল্লেখের ক্ষেত্রে তাদের জন্য অপরিহার্যভাবে এ বিশ্বাসও অন্তর্ভূক্ত করেছেন যে, প্রত্যেক শিয়ারই এ বিশ্বাস থাকতে হবে যে, হজরত আলি রাদি. রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসিয়াত এবং আল্লাহ তায়ালার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দ্বারা মুসলমানদের ইমাম।[12] 

চলবে…


[1] দাবিস্তানে মাজাহিব: ১/২৪৩

[2] আল মিলালু ওয়ান নিহাল: ১৬৯ পৃ.।

[3] সাদ বিন আবদুল্লাহ আল কুম্মি—শিয়াদের কাছে সম্মানীত ব্যক্তি, বহু হাদিস বর্ণনাকারী, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। তার কিতাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘আয-যিয়া ফিল ইমামাহ এবং আল মাকালাতুল ইমামিয়্যাহ। তিনি ৩০১ হি. ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ বলেন: ২৯৯ হিজরি ইন্তেকাল করেছেন। তুসি; আল ফিহরাস্ত: ১৩৫ পৃ.।

[4] আল মাকালাত ওয়াল ফিরাক: ৩ পৃ.

[5] আল মাকালাত ওয়াল ফিরাক: ১৫ পৃ.

[6] হাসান ইবনে মুস আন নাওবাখতি। তুসি বলেন: তিনি ছিলেন ইমাম ও বিশুদ্ধ আকিদাসম্পন্ন ব্যক্তি। তার লেখিত অনেক গ্রন্থ রয়েছে। এরমধ্যে ‘কিতাবুল আরা ওয়াদদিয়ানাত’-অন্যতম। তিনি ৩০০ হিজরির পর ইন্তেকাল করেন। তুসি; আল ফিহরাস্ত: ৯৬ পৃ., আরো দেখুন ইবনে নাদিম: আল ফিহরাস্ত ১৭৭ পৃ., আল কুম্মি; আল কিনা ওয়াল আলকাব: ১/১৪৮, আল আরদাবিলি; জামউর রুয়াত: ১/২২৮, জাহাবি; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা:  শিয়া, দার্শনিক বহুগ্রন্থ প্রণেতা: ১৫/৩২৭।

[7] ফিরাকুশ শিয়া: ২, ১৭

[8] মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে নুমান আল আকবারি; উপানাম মুফিদ। শিয়াদের ধারণামতে সে ১২তম ইমাম গায়েব মাহদির সঙ্গে পত্রালাপের মাধ্যমে সম্মানীত হয়েছে। তার লেখিত প্রায় দুই শতাধিক কিতাব রয়েছে। খতিবে বাগদাদি রহ. লেখেন: শায়েখ মুফিদ ছিল পথভ্রষ্ট ইমামদের অন্যতম একজন। তার কারণে বহু মানুষ ধ্বংসের পথে গিয়েছে। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তার হাত থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি ৪১৩ হিজরি ইন্তেকাল করেন। খতিব বাগদাদি; তারিখে বাগদাদ: ৩/২৩১, ইবনুল জাওজি; আল মুনতাজিম: ৮/১১, তুসি: আল ফিহরিস্ত: ২৩৮-৩৯ পৃ., কুম্মি: আল কিনা ওয়াল আলকাব: ৩/১৬৪, ইবনে নাদিম; আল ফিহরিস্ত: ১৯৭ পৃ.।

[9] আওয়ায়িলু ওয়াল মাকালাত: ৩৫ পৃ.।

[10] আওয়ায়িলু ওয়াল মাকালাত: ৩৭ পৃ.।

[11] আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন বিন আলি আত-তুসি—ইমামিয়া শিয়াদের শীর্ষ ইমাম। শিয়াদের উসুলে আরবায়া বা মৌলিক ৪ কিতাবের অন্যতম দুটো কিতাব তাহজিবুল আহকাম এবং আল ইস্তিবসারের লেখক। শিয়াদের কাছে তিনি শায়খুত তায়িফা নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ৪৬০ হিজরি ইন্তেকাল করেন। বিস্তুরিত দেখুন:  কুম্মি: আল কিনা ওয়াল আলকাব: ২/৩৫৭, বাহরানি: লু’লু’য়াতুল বাহরাইন: ২৯৩-৩০৪, ইবনে হজর; লিসানুল মিজান: ৫/১৩৫।

[12] বিস্তারিত দেখুন: তুসি; তালখিসুস শাফি: ২/৫৬-৫৭।



Leave a comment