হেযবুত তওহীদের পরিচয় ও আকিদা 

প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সাথে অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সংগঠনের নাম ‘হেযবুত তওহীদ’ । বহুরূপী এই সংগঠনটির কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতেও তাদের প্রচারণা ব্যাপক হচ্ছে । ফলে সরলমনা অনেক মুসলমান না বুঝেই তাদের দলে যোগ দিচ্ছেন। অনেকে আবার তাদের চটকদার কথায় বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের ঈমান হারাচ্ছেন। যেটি দ্বীন সচেতন প্রতিটি ব্যক্তির জন্যই খুব উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার। তাই প্রত্যেকের জ্ঞাতার্থে সংক্ষিপ্তকারে তাদের পরিচয় ও স্বরূপ বুঝানোর প্রায়স চালাবো ইন শা আল্লাহ।

হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠা ও উৎস

হেযবুত তওহীদ দলটির প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইল জেলার সদর থানার করটিয়া এলাকার মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। যিনি ছিলেন কলেজপড়ুয়া একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। আরবী ভাষা সম্পর্কে তার তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না। আর কুরআন-হাদীসের ভাষায়ও ছিলেন একেবারেই অজ্ঞ। যে কথা তিনি নিজেও কোনো কোনো বক্তব্যে স্বীকার করেছেন। (দ্র. আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৫৫) তাই স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, তিনি যে ইসলামের নামে এত কিছু লিখেছেন বা বলেছেন, তা তিনি কোথায় পেলেন?

এর উত্তর তালাশ করতে আমরা পন্নী সাহেবের জীবনী পাঠ করে অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য খুঁজে পাই। তা হল, কিনি কলকাতা থাকাকালীন ‘তেহরিক-এ-খাকসার’ নামক একটি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। যে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাঞ্জাবের এনায়েতুল্লাহ খান মাশরেকী। তার নিজস্ব কিছু ভ্রান্ত চিন্তাধারা ছিল। যে চিন্তাধারার কারণে তৎকালীন আরব ও অনারবের প্রায় সকল আলেম তার কাফের হওয়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন। কিন্তু পন্নী সাহেব মাশরেকীর সেই চিন্তাগুলোকেই আপন করে নেন এবং এতটাই আত্মস্থ করে নেন যে, ১৯৪৭-এর পর ‘খাকসার আন্দোলন’ বিলুপ্ত হলেও তিনি সে মতবাদগুলো ছাড়তে পারেননি; বরং তিনি নিজ এলাকায় এসে এগুলোকে নতুন রূপ দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। যা পরবর্তীতে আরো ডালপালা ছড়িয়ে ১৯৯৫ সানে ‘হেযবুত তওহীদ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। এভাবেই শুরু হয় এই সংগঠনটির কার্যক্রম।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, পন্নী সাহেব তার সমস্ত চিন্তা-চেতনা মাশরেকী থেকে গ্রহণ করলেও ‘হেযবুত তওহীদ’ গঠন করার পর তিনি তার অনুসারীদের কাউকে তা বুঝতে দেননি। এমনকি তার কোনো লেখায় বা বক্তৃতায় মাশরেকীর নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেন নি। বরং এগুলোকে নিজের কাশ্ফ ও ইল্হামের নামে চালিয়ে নিজেকে মুজাদ্দিদ বা দ্বীন সংস্কারকের আসনে আসীন করতে চেয়েছেন। (দ্র. আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৫৪) যে আন্দোলনের গোড়াতেই এরকম মিথ্যাচার ও কপটতার আশ্রয় নেওয়া হয়, তার ভবিষ্যৎ আর কীইবা হতে পারে!?

হেযবুত তওহীদের মৌলিক কিছু কুফুরী মতবাদ

হেযবুত তওহীদের লোকদের কথাবার্তা শুনে সাধারণ মানুষ হয়তো ভাববেন, এরা তো ভালো কথাই বলছে। সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলাপ করছে। জাতীয় বিষয়াদির ব্যাপারে আওয়াজ তুলছে। তাহলে তাদের সমস্যা কোথায়? এর উত্তর জানার আগে প্রথমেই আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, একজন মুসলিমের নিকট যে কোনো কিছু মাপার অন্যতম মাপকাঠি হচ্ছে শরীয়ত; কুরআন ও সুন্নাহ। তাই কোনো দল বা সংগঠন আমাদেরকে দাওয়াত দিলে প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তাদের আকীদা-বিশ্বাস ঠিক আছে কি না? তাদের ঈমান ঠিক আছে কি না?

হেযবুত তওহীদ দলটি নিয়ে যদি আমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করি, তাহলেই বুঝতে পারব, এসব ভালো ভালো কথা বলার জন্য তারা আলাদা একটি সংগঠন তৈরি করেনি; বরং এর পেছনে তাদের ভিন্ন একটি উদ্দেশ্য আছে। আর তা হল, মাশরেকী সাহেব থেকে ধার করা এমন কিছু মারাত্মক মতবাদ তারা এ দেশে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যার কোনো একটিকেও যদি কেউ সমর্থন করলে তার ঈমান শেষ হয়ে যাবে। আমরা এখানে সংক্ষেপে তাদের এজাতীয় মৌলিক কিছু কুফুরী মতবাদ তুলে ধরছি–

১. সব ধর্মই সত্য এবং যে কোনো ধর্ম পালনে মুক্তি আছে বলে মনে করা

এটি হেযবুত তওহীদের অন্যতম একটি কুফুরী চিন্তা। তারা শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পরও অন্যান্য ধর্মগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। তাদের ধারণা মতে, সব ধর্মই সত্য। সকল ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মপ্রবর্তকগণ আল্লাহর প্রেরিত। তাই মানুষ এগুলোর যে কোনোটি মেনে চলতে পারে। হেযবুত তওহীদ মানুষকে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের দিকে আহ্বান করে না। আমরা তাদেরই প্রকাশিত বইপুস্তক থেকে এজাতীয় কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরছি–

হেযবুত তওহীদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘মানবসমাজে ধর্ম-অধর্ম ও শান্তি-অশান্তির চিরন্তন দ্বন্দ্ব’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে– প্রকৃত সত্য হলো- স্রষ্টা প্রদত্ত সকল ধর্মই সত্যধর্ম। এগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এর যে কোনটি মানুষ মেনে চলতে পারে।”

এমনিভাবে তাদের প্রকাশিত ‘মহাসত্যের আহ্বান’ নামক একটি সংকলনের ৮৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে– মানবজাতির ঐক্যই স্রষ্টার কাম্য। তাই সকল ধর্মেই আছে ঐক্যের শিক্ষা। কিন্তু ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মকেই বিভেদের প্রাচীর বানিয়ে রেখেছে। তারা অন্য ধর্মগুলোকে মিথ্যা এবং সেই ধর্মের অনুসারীদেরকে জাহান্নামী, কাফের বলে গালিগালাজ করে। অথচ সকল ধর্মই আল্লাহর প্রেরিত, ধর্ম প্রবর্তকগণও তাই।”

‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ‎ঐক্যের আহ্বান’ নামক আরেকটি গ্রন্থের ৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে– আমরা কাউকে এসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা ইহুদি ইত্যাদি কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করছি না। আমাদের কথা হচ্ছে, যার যার ধর্ম বিশ্বাস তার তার কাছে।”

শোষনের হাতিয়ার—৭০ পৃ. রয়েছে: হিন্দুদের সনাতন ধর্ম হলো আল্লাহর বর্ণিত দ্বীনুল কায়্যিমাহ তথা শাশ্বত ও চিরন্তন ধর্মআর এটাই হলো তাওহীদ

চলমন সঙ্কট নিরসনে হেযবুত তওহীদের প্রস্তাবনা—৫ পৃ. রয়েছে: গৌতমবুদ্ধ, রাম, শ্রীকৃষ্ণ, মহাবীর, যরোথুস্ত্র, যুধিষ্ঠির ও সক্রেটিস এরা প্রত্যেকেই আল্লাহর নবী ও রাসূল ছিলেন এবং তাদের প্রেরিত ধর্মসহ পৃথিবীতে যত ধর্ম প্রচালিত রয়েছে, সবগুলোই ইসলামের আদিরূপ

এরকম আরো ভুরি ভুরি বক্তব্য তাদের লেখা ও বক্তৃতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অথচ মুসলিম মাত্রই জানেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওতপ্রাপ্তির পর পূর্ববর্তী সকল আসমানী ধর্মও রহিত হয়ে গেছে। একমাত্র ইসলামকেই আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছেন। খোদ কুরআন কারীমে সেই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: اِنَّ الدِّیْنَ عِنْدَ اللهِ الْاِسْلَامُ  নিঃসন্দেহে ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র (মনোনীত) দ্বীন। সূরা আলে ইমরান: ১৯

আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন: وَ مَنْ یَّبْتَغِ غَیْرَ الْاِسْلَامِ دِیْنًا فَلَنْ یُّقْبَلَ مِنْهُ، وَ هُوَ فِی الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করতে চাইবে, তা তার কাছ থেকে ‎কিছুতেই কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। সূরা আলে ইমরান : ৮৫

আর হাদিসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্ট বলেছেন:

وَالَّذِيْ نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِيْ أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الأُمَّةِ يَهُوْدِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ، ثُمَّ يَمُوْتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِيْ أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ.

সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, এই উম্মতের ইহুদী বা নাসারা যেই আমার দাওয়াত পাবে, অতঃপর আমার আনীত দ্বীনের ওপর ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, সে হবে জাহান্নামী। সহিহ মুসলিম: হা.নং: ১৫৩

তাছাড়া গৌতমবুদ্ধ ছিলো বৌদ্ধধর্মের জনক আর যরোথুস্ত্র অগ্নীপূজার উদ্ভাবক অপরদিকে রাম, শ্রীকৃষ্ণ, মহাবীর ও যুধিষ্ঠিররা  মূর্তি পুজারী। এসব ব্যক্তি যদি নবিই হতেন আর তাদের প্রচারিত ধর্ম ইসলামই হতো, তবে কেনো আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রচারিত ও উদ্ভাবিত ধর্মকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা দিয়ে কেবল ইসলামকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীনরূপে মনোনীত করলেন? তাদের এসব উক্তি কি সরাসরি কুরআনের বিরোধিতা নয়?

২. ইসলামকে বিকৃত আখ্যায়িত করা

হেযবুত তওহীদের লোকেরা সকল বাতিল ধর্মগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করলেও ইসলামের ব্যাপারে তারা বলে, ইসলাম সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গেছে। তাদের ভাষ্যমতে, যুগপরম্পরায় চলে আসা এই ইসলাম আল্লাহ-রাসূলের ইসলাম নয়। এটি প্রকৃত ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটি ধর্মবিশ্বাস। পন্নী সাহেব তার এই কুফুরী মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে ‘এ ইসলাম ইসলামই নয়’ নামে ৪০০ পৃষ্ঠার একটি স্বতন্ত্র বই লিখেছেন। আমরা হেযবুত তওহীদের বইগুলো থেকে এজাতীয় কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরছি–

‘মহাসত্যের আহ্বান’ নামক সংকলনটির ২৭ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে– আমরা দুনিয়াময় ইসলাম নামে যে ধর্মটি দেখতে পাচ্ছি সেটা আল্লাহর রসুলের রেখে যাওয়া ইসলাম নয়, এটা একটি বিকৃত ও বিপরীতমুখী ধর্মবিশ্বাস।”

‘এ জাতির পায়ে লুটিয়ে পড়বে বিশ্ব’ নামক আরেকটি বইয়ের ৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে– অতীতের সবগুলি ধর্মই যেমন কাল পরিক্রমায় বিকৃত হোয়ে গেছে, এসলামও ১৩০০ বছরে বিকৃত হোতে হোতে একেবারে বিপরীতমুখী হোয়ে গেছে।”

পন্নী সাহেব তার ‘এ ইসলাম ইসলামই নয়’ বইয়ের ৪০-৪১ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন– যেসব বিকৃতি আসার ফলে পূর্ববর্ত্তী অন্যান্য ধর্ম বাতিল করে আল্লাহ নতুন নবী পাঠিয়েছেন সেই সব বিকৃতি এই শেষ দীনেও এসে গেছে।”

‘ইসলামকে বিকৃত আখ্যায়িত করা’ এটি প্রায় সকল বাতিলপন্থীদের অন্যতম একটি মৌলিক এজেন্ডা। কারণ, অন্ধকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেরকম আলোকে দূরে সরিয়ে দিতে হয়, ঠিক তেমনি বাতিলপন্থীরা নিজেদের মনগড়া ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রকৃত ইসলামকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। অথচ তারা এটা ভেবে দেখে না যে, তাদের এই প্রচেষ্টা কখনো সফল হওয়ার নয়। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নিজে ইসলামের হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন। এজন্যই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে সুস্পষ্ট বলেছেন:

لَنْ يَزَالَ أَمْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ مُسْتَقِيْمًا حَتَّى تَقُوْمَ السَّاعَةُ কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত এই উম্মাহর অবস্থা সঠিক ও সরল থাকবে। –বুখারি: ৭৩১২

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:

لَنْ يَبْرَحَ هَذَا الدِّيْنُ قَائِمًا يُقَاتِلُ عَلَيْهِ عِصَابَةٌ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ حَتَّى تَقُوْمَ السَّاعَةُ এই দ্বীন সর্বদা সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং একদল মুসলমান কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীনের জন্য জিহাদ করতে থাকবে। – মুসলিম হা.নং: ১৯২২

৩. পৃথিবীর সকল মুসলমানকে কাফের সাব্যস্ত করা

এটি হেযবুত তওহীদের আরেকটি মারত্মক কুফুরী আকিদা। তারা নিজেদের দলের লোক ছাড়া পৃথিবীর সকল মুসলমানকে কাফের ও মুশরিক মনে করে। মুসলমানদেরকে তারা ‘অভিশপ্ত’ ও ‘লা‘নতপ্রাপ্ত’ বলে গালাগাল করে। আমরা তাদের বইগুলো থেকে এ ধরনের কয়েকটি বক্তব্য উদ্ধৃত করছি–

ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা—৪৮  পৃ. তিনি সরাসরি দাবি করেন, রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের ৬০/৭০ বছর পর এই উম্মত ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছে।

‘আসমাউ ওয়া আত্তাবেয়্যু’ নামক একটি বইয়ের ৪২ নং পৃষ্ঠায় হেযবুত তওহীদের কর্মীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে– “ভুলে যেও না আমরা শেরক ও কুফরের মহাসমুদ্রের মধ্যে মাত্র এক ফোঁটা হেদায়াহ।”

এমনিভাবে ‘মহাসত্যের আহ্বান’ নামক সংকলনটির ১৫ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে– “এই জাতি তার সমস্ত নামাজ, যাকাত, হজ্ব রোযা সব সুদ্ধ বেঈমান অর্থাৎ কাফের, মোশরেক।”

‘ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা’ নামক পুস্তিকার ১৩ নং পৃষ্ঠায় এভাবে বলা হয়েছে– “এই জাতি এখন আল্লাহর লা’নতের ও গযবের বস্তু, এর অবস্থা এখন অতীতের অভিশপ্ত ইহুদি জাতির চেয়েও নিকৃষ্ট।”

এভাবেই তারা পুরো উম্মতে মুসলিমাহর বিরুদ্ধে নিজেদের ভেতরে পুষে রাখা ক্ষোভ ও ঘৃণা উগরে দেন এবং কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই তারা সমস্ত মুসলমানকে কাফের সাব্যস্ত করেস। অথচ হাদিসে কোনো মুসলমানকে প্রমাণহীণ কাফের বলার ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। আল।লাহর রাসুল বলেন:

مَنْ رَمَى مُؤْمِنًا بِكُفْرٍ فَهُوَ كَقَتْلِه. কোনো মুমিনকে কুফুরীর অপবাদ দেওয়া তাকে হত্যা করার সমতুল্য। –বুখারি: হা.নং: ৬১০৫

তিনি আরো বলেন:

أَيُّمَا امْرِئٍ قَالَ لِأخِيْهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا، إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ، وَإِلّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ. যে কেউ তার ভাইকে কাফের বলবে, সেটা তাদের দুজনের কোনো একজনের ওপর বর্তাবে। যদি সে যা বলেছে তা বাস্তব হয় তবে তো হলো। অন্যথায় তার নিজের ওপরই তা বর্তাবে। –মুসলিম: হা.নং: ৬০

৪. নামাযসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোতে বিকৃতি সাধন ও ইবাদত হওয়ার অস্বীকৃতি

ইসলামকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য হেযবুত তওহীদের লোকেরা ইসলামের সর্বপ্রধান ভাগ ইবাদতে হাত দিয়েছে। তারা ইসলামের ইবাদতগুলোকে ইবাদত স্বীকার করতেই রাজি না। এগুলোকে তারা বিভিন্ন নাম দিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। আর নামায যেহেতু ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, এজন্য নামাযের মধ্যে তারা বিকৃতি ঘটিয়েছে সবচেয়ে বেশি। পন্নী সাহেব নামাযের এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যা গত চৌদ্দ শ বছরে পন্নী সাহেব এবং তার গুরুরা ছাড়া আর কেউ হয়তোবা তা কল্পনাও করেনি। অথচ ইসলামের ইবাদতের কোনো একটি অংশকে অস্বীকার করা কিংবা এগুলোর কোনোটির মাঝে কোনো ধরনের বিকৃতি সাধন করা সুস্পষ্ট কুফর। এ বিষয়ে তাদের বক্তৃতা ও লেখা ভুরি ভুরি। উদাহরণস্বরূপ তাদের বই থেকে এ ধরনের কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরছি–

‘মহাসত্যের আহ্বান’ নামক সংকলনের ৯ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে– “এবাদত হচ্ছে আল্লাহর খেলাফত করা, কিন্তু ভুল করে নামাজ, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদিকে এবাদত বলে মনে ‎করা হচ্ছে।”

একই সংকলনের ১০৪ নং পৃষ্ঠায় বলেন: “আমাদের বুঝতে হবে যে, নামাজ, রোযা, উপবাস, উপাসনা, পূজা অর্চনা ধর্মের মূল কাজ নয়।”

এমনিভাবে ‘এ ইসলাম ইসলামই নয়’ বইয়ের ১৯ নং পৃষ্ঠায় লিখেন– “দীনের আর বাকি যেটুকু আছে নামায, রোযা, ইত্যাদি হাজারো কাজ, সব আনুষাঙ্গিক, গৌণ।”

পন্নি সাহেব তার এই কুফুরি মতবাদকে মযবুত করতে সরাসরি কালিমাতু তায়্যিবায় হাত দিয়ে তার অর্থে বিকৃতি ঘটিয়েছেন। তিনি বলেন: কালিমালা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোন বিধানদাতা নেইবর্তমান সময়ে যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ বা উপাস্য নেই করা হয় এটা ভুলএবং ইহুদি খ্রিস্টানদের থেকে নির্ধারীত অর্থ (মহাসত্যর আহ্বন—৭-৮) (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে যমানার এমামের পত্রাবলী—১০)

অথচ ইলাহ অর্থ শাসক বলা সুস্পষ্ট কুরআন ও হাদিসের লঙ্ঘন। সরাসরি আল্লাহ কতৃক নবিদের প্রেরণের উদ্দেশ্যের বিপরীত।  

আমরা কুরআনের কয়েকটি আয়াত থেকে (إله) ইলাহের অর্থ দেখি আল্লাহ তায়ালা কি বলেছেন:

1. আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ আমি নূহকে প্রেরণ করেছি তার সম্প্রদায়ের নিকট, অতঃপর তিনি বললেন হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতিত অন্য কোনো মা’বুদ নেই। -সুরা আ’রাফ, ৫৯

উক্ত আয়াতে  مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ অংশটি কালেমা তায়্যিবার সমার্থক। আর এতে إله শব্দটির অর্থ যে মা’বুদ তা আয়াত থেকেই স্পষ্ট। কারণ, নুহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় শিরক ফীল উলুহিয়্যাতে লিপ্ত ছিল। এবং তারা বহু ইলাহের ইবাদত করত। তাই তিনি তাদেরকে এই বলে আহবান করলেন اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ আল্লাহর-ই ইবাদত করো। কারণ, مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ তিনি ব্যতিত অন্য কোনো মা’বুদ নেই। এখানে ইলাহ অর্থ যে মা’বুদ তা আয়াত থেকেই স্পষ্ট।

এটি আরো স্পষ্ট হয়ে যায় নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের বক্তব্য থেকে। তিনি যখন তাদের বাতিল মা’বুদের পূজা পরিত্যাগ করতে বললেন তখন তারা বললো:

 لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدّٗا وَلَا سُوَاعٗا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسۡرٗا তোমরা কখনও পরিত্যাগ করো না তোমাদের ইলাহসমূহকে। পরিত্যাগ কর না ওয়াদ্দ’, সুওয়া’আ, ইয়াগুছ, ইয়া’উক ও নাসরকে। সূরা নূহ, ২৩

আয়াতটিতে ءَالِهَتَكُمۡ  এর অর্থ মা’বুদ তা একদমই স্পষ্ট। নুহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের বিপরীত তারা সত্য মা’বুদ রাব্বুল আলামিনের পরিবর্তে যেসব বাতিল মাবুদের ইবাদত করত তাদের একেকজনের নাম উল্লেখ করে বলেছে, তারা এদের ইবাদত ত্যাগ করতে পারবে না। আর এসব তো কোনো শাসকের নাম নয় বরং তো মূর্তির নাম।

২. إله অর্থ মা’বুদ তার আরেকটি প্রমাণ হলো সূরা মায়েদার নিম্নোক্ত আয়াত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ… مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ

আর (স্মরণ করুন) যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা ইবনে মারয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার মাতাকে মা’বুদরূপে গ্রহণ করো? সে বলবে.., আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ব্যতীত তাদেরকে কিছুই বলিনি। তা এই যে, তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত করো। সুরা মায়িদা, ১১৬-১১৭

এখানে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা আ.-কে জিজ্ঞেস করবেন তিনি কি মানুষকে বলেছিলেন তাকে ও তার মাকে যেন তারা ইলাহরূপে গ্রহণ করে? উত্তরে তিনি বলবেন আমি কেবল তাদেরকে আপনার ইবাদত করতেই বলেছি। সুতরাং বোঝা গেল, ইলাহ বলতে মাবুদই উদ্দেশ্য, হাকিম বা শাসক নয়। যদি হাকিম উদ্দেশ্য হতো তবে ঈসা আ. অবশ্যই উত্তরে সে প্রসঙ্গে কিছু বলতেন। কিন্তু সে সম্পর্কে তিনি কিছুই বলেননি।

৩. আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتَوْا عَلَى قَوْمٍ ‌يَعْكُفُونَ ‌عَلَى ‌أَصْنَامٍ لَهُمْ قَالُوا يَا مُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ ‌‌

আর আমি বনি ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম; অতঃপর তারা এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছল, যারা তাদের প্রতিমা পূজায় রত ছিল। বনি ইসরাঈল বলতে লাগল, হে মূসা! আমাদের জন্যও ঐরূপ একটি ইলাহ নিয়ে আসুন যেমন রয়েছে তাদের ইলাহসমূহ। তিনি বললেন নিশ্চয় তোমরা মূর্খ লোক। -সূরা আ’রাফ, ১৩৮

উক্ত আয়াতের অংশ اجْعَلْ لَنَا إِلَهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ থেকে পরিষ্কার যে, ইলাহ বলাই হয় মা’বুদকে। হাকেম বা শাসককে নয়। কেননা বনী ইসরাঈল পূজার জন্যই মূসা আ. এর নিকট তাদের মত একটি إله অর্থাৎ পূজার মূর্তির আবেদন করেছিল।

৪. সামেরীর ঘটনা থেকেও إله অর্থ মা’বুদ তা ভালোভাবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

فَأَخۡرَجَ لَهُمۡ عِجۡلٗا جَسَدٗا لَّهُۥ خُوَار فَقَالُواْ هَٰذَآ إِلَٰهُكُمۡ وَإِلَٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِيَ ٨٨

তারপর সে (সামেরী) তাদের জন্য বের করে আনল একটা বাছুর একটি দেহকাঠামো, যার মধ্যে ছিল গরুর আওয়াজ। তখন সে বলতে লাগল, ‘এটা তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন। -সূরা ত্ব-হা: ৮৮

আয়াতটিতে هَٰذَآ إِلَٰهُكُمۡ وَإِلَٰهُ مُوسَىٰ   থেকে (এটি তোমাদের ইলাহ ও মুসারও ইলাহ) ইলাহের অর্থ যে মা’বুদ তা সুস্পষ্ট। কারণ, বাছুরের মূর্তিকে হাকেম বা শাসক আখ্যা দেওয়ার কোনোই সুযোগ নেই।

সামিরীর উক্ত ঔদ্ধত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে মূসা আলাইহিস সালাম যে তাওহীদের ঘোষণা দিয়েছেন তা থেকেও ইলাহ এবং কালেমা তায়্যিবার অর্থ সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন-

وَٱنظُرۡ إِلَىٰٓ إِلَٰهِكَ ٱلَّذِي ظَلۡتَ عَلَيۡهِ عَاكِفٗاۖ لَّنُحَرِّقَنَّهُۥ ثُمَّ لَنَنسِفَنَّهُۥ فِي ٱلۡيَمِّ نَسۡفًا ٩٧ إِنَّمَآ إِلَٰهُكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ وَسِعَ كُلَّ شَيۡءٍ عِلۡمٗا ٩٨

তুমি তোমার এ (অলীক) মা’বুদকে দেখ, যার কাছে তুমি স্থির বসে থাকতে। আমরা একে অবশ্যই জ্বালিয়ে দেব, তারপর একে (ছাইগুলোকে) সাগরে বিক্ষিপ্ত করে দেব। তোমাদের মা’বুদতো আল্লাহই, যিনি ছাড়া কোন মা’বুদ নেই। তার জ্ঞান সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে। -সূরা ত্ব-হা: ৯৭-৯৮

এমন আরো অসংখ্য আয়াত রয়েছে যা কালিমার অর্থকে সুস্পষ্ট করে। রয়েছে অসংখ্য হাদিসও। সেক্ষেত্রে আল্লাহ ও তার রাসুল কতৃক নির্ধারিত অর্থকে বিকৃত করা সুস্পষ্ট কুরআন অস্বীকার।

তাছাড়া আমরা যদি ইবাদতের অর্থও বুঝতে পারি, তবে আমাদের কাছে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। সংক্ষেপে ইবাদত হলো আল্লাহ তায়ালার নিঃশর্ত আনুগত্য। তিনি যে বিধান পালন করতে বলেছেন, তা পালন করা আর যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা। তিনি যেভাবে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে বলেছেন, সেভাবে সালাত, সিয়াম, হজ যাকাতেরও নির্দেশ দিয়েছেন। বিচার ব্যবস্থাও তার বিধান দিয়ে সাজাতে বলেছেন। কাজেই সালাত ও সিয়ামই কেবল ইবাদত নয়, ইবাদতের অংশ। অনুরূপ খেলাফত ও শাসন ব্যবস্থাও ইবাদতের অংশ। কেবল সালাত ও সিয়ামকে ইবাদত সাব্যস্ত করে ইবাদতের আরেকটি অংশ শাসন ব্যবস্থাকে তার থেকে বের করে দেওয়া চরম মূর্খতা ও গোমরাহি। উভয়টিই আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ। সর্বোচ্চ এতটুকু বলা যেতে পারে যে, খিলাফত কায়েমের দ্বারা অন্যান্য ইবাদত নিশ্চিত করার পথ মসৃণ হয়। কিন্তু ইবাদতের হাকিকত না বুঝে নিজের মতো করে একটি অর্থ নির্ধারণ করে সেই ভ্রান্ত অর্থ প্রতিষ্ঠা করা কালিমার বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়। যা চরম পথভ্রষ্টতার পরিচয়বাহক।

৫. কুরআন কতৃক ফরজকৃত বিধানের অস্বীকার করা

হেযবুত তওহীদ শুধু ইবাদতই নয় বরং আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত ফরজ বিধানও অস্বীকার করেছে। শুধু অস্বীকারই নয় বরং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। এরমধ্যে অন্যতম একটি বিধান হলো পর্দা। এ সম্পর্কে তাদের ওয়েবসাইটে অগনিত লেখা ও অসংখ্য বক্তৃতা রয়েছে। যেখানে তারা পর্দাকে ‘বাক্সবন্দি করা’—এর মতো তিরস্কারমূলক শব্দ ব্যবহার করেছে। এবং নাস্তিকদের মতো এই পর্দাকে নারী উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধক বলে সাব্যস্ত করছে। আমি উদাহরণস্বরূপ একটি লেখা উদ্ধৃত করছি: ‘পাশ্চাত্যের মানসিক দাসত্ব দূরীকরণে গণমাধ্যমের করণীয়’ নামক বইয়ের ৬৩‎ নং পৃষ্ঠায় লেখে: “নারীকে একশ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী ধর্মের দোহাই দিয়ে, পর্দার অজুহাতে, তাদের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষার ‎অজুহাতে মিথ্যে ফতোয়ার বেড়াজালে বন্দি করে আপাদমস্তক কাপড়ে আবৃত কিম্ভূতকিমাকার অবলা ‎প্রাণীতে পরিণত করে রেখেছে।”‎

 অথচ আল্লাহ তায়ালা সুরা নুর এর ৩০ ও ৩১ নাম্বার আয়াত, সুরা আহযাবের ৩৩,৫৩ ও ৫৯ নং আয়াতে সুস্পষ্ট পর্দার নির্দেশ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য হাদিসও রয়েছে। এ সমস্ত আয়াত ও হাদিসকে অস্বীকার করে এ ফরজ বিধানকে বিকৃতভাবে উপাস্থাপন ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাদের কুফুরিকে প্রকট করে।

৬. দাজ্জালের আগমনকে অস্বীকার করা

হেযবুত তওহীদের বড় বড় কুফুরির অন্যতম একটি হলো দাজ্জালের আগমনকে অস্বীকার করা। এ সম্পর্কে ‘দাজ্জাল’ নামক স্বতন্ত্র একটি বইই রয়েছে। তাদের দাবিমতে দাজ্জাল হলো ইয়াহুদি খ্রিস্টান সভ্যতা। সে হিসেবে বর্তমানে দাজ্জালের শাসন চলছে। ‘চলমন সঙ্কট নিরসনে আদর্শিক লড়াই অপরিহার্য’ বইয়ের—১৩ পৃ. রয়েছে: বর্তমান পৃথিবীর শাসন ব্যবস্থা দাজ্জালদের হাতেসেই শাসন ক্ষমতাই আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে হেযবুত তওহীদ কাজ করে যাচ্ছে

অর্থাৎ বর্তমান আল্লাহ তায়ালা অক্ষম, তাঁর নিজের কোন ক্ষমতা বা কুদরাত নেই। ফলে হেযবুত তওহীদ তাকে তাঁর ক্ষমতা এনে দেওয়ার জন্য চেষ্টাপ্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। এ জন্যই তারা দাবি করে যে: আল্লাহ তায়ালা তার প্রভুত্তের আসনে নেই। (আসমাউ ওয়া আত্তাবেয়্যু—৬) অথচ দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদিস মুতাওয়াতির সুত্রে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাম থেকে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে। কাজেই তাদের এই দাবি হাস্যকর এবং মুতাওয়াতির হাদিসের অস্বীকার। 

৭. ইসলামী শরীয়ত ও রাসূলের সুন্নাহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা

কুরআন ও সুন্নাহর অকট্ট বিষয় বিকৃত করার পাশাপাশি হেযবুত তওহীদের লোকেরা ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করে। তারা রাসুলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ ও সুন্নাহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। রাসূলের বিভিন্ন সুন্নাহকে তারা এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা কোনো মুমিনের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কারণ, মুমিন তো বলাই হয় এমন ব্যক্তিকে, যার আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি পূর্ণ ভক্তি, আস্থা ও বিশ্বাস থাকবে। পক্ষান্তরে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের উৎসই হচ্ছে ঘৃণা ও অবিশ্বাস। এক্ষেত্রে তাদের তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা বুঝাতে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি:

‘ইসলাম ‎‎কেন আবেদন হারাচ্ছে?’ নামক বইয়ের ৬১ নং পৃষ্ঠায় লেখা আছে– “আজ যে ইসলাম চলছে তা যে মুসলিম উৎপাদন করে তাদের আকীদা হলো এই যে … রসুলাল্লাহকে পাঠানো হয়েছিল মানুষকে টাখনুর উপর পাজামা পরার মত, মাথায় টুপি দেবার মত, দাড়ি রাখানোর মত, দাঁত মাজার মত, কুলুখ নেয়ার মত, ডান পাশে শোয়ার মত তুচ্ছ ব্যাপার শেখাতে।

‘এ ইসলাম ইসলামই নয়’ বইয়ের ৯২ নং পৃষ্ঠায় পন্নী সাহেব লিখেছেন– “কার্যতঃ মোশরেক হয়ে মাথা ন্যাড়া করে, মোছ কামিয়ে, টুপি পাগড়ী মাথায় দিয়ে কাঁধে চেক রুমাল ফেলে, টাখনুর উপর পাজামা পড়ে আর পাঁচবার মসজিদে দৌড়ে এরা আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন এই ভেবে যে, তারা শুধু উম্মতে মোহাম্মদী নন, একেবারে নায়েবে নবী।

একই বইয়ের ২২৪ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে– “আসল জান্নাতী ফেরকার সুন্নাহর সাথে বাকি বাহাত্তর ফেরকার সুন্নাহর আসমান-যমিন তফাৎ। বাহাত্তর ফেরকার কাছে সুন্নাহ হল দাঁত মেসওয়াক করা।

উক্ত বইয়ের ২৬৫ নং পৃষ্ঠায় আরো বলা হয়েছে– “দাঁড়ি, টুপি, মোজা, পাজামা, টাখনু, তসবিহ, তাহাজ্জুদ, কুলুখ, যিকর, ছোট খাট সহজ অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুন্নাহ, ডান পা প্রথমে ফেলে মসজিদে ঢোকা, ডান পাশে শোওয়া, নফল নামায, নফল ‎‎রোযা, মেসওয়াক ইত্যাদি নিয়ে এই জাতি মহাব্যস্ত।

৮. বিভিন্ন হারাম বিষয়াদির সমর্থন ও বৈধতা দান করা

ইসলামের ইবাদতগুলোকে অস্বীকার, বিকৃতি ও বিদ্রুপ করার পাশাপাশি হেযবুত তওহীদের লোকেরা বিভিন্ন হারাম বিষয়াদির সমর্থন করে। কুরআন-সুন্নাহ্য় সুস্পষ্ট হারাম, এমন অনেক বিষয়কে তারা বৈধ মনে করে। বিভিন্ন কবিরা গুনাহের প্রতি শিথিলতা প্রদর্শন করে। নাচ-গান, নাটক-উৎসব ইত্যাদি বিষয়কে তারা কেবল জায়েয নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে ইবাদততুল্য গণ্য করে।

‘প্রিয় দেশবাসী’ নামক একটি বইয়ের ১২৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে– “যে গান, নৃত্য, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটক ইত্যাদি শিল্পচর্চা মানবজাতির কল্যাণে সহায়ক হবে … সেগুলো কেবল বৈধ নয়, আমরা মনে করি সেগুলো ইবাদততুল্য।”

এমনিভাবে ‘‎‎‎‎‎‎‎‎‎মহাসত্যের আহ্বান’ নামক সংকলনটির ৯৪ নং পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে– “নবান্ন উৎসব, চৈত্রসংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি কোনো উৎসবই শরিয়ত পরিপন্থী হতে পারে না।” এক্ষেত্রে নাস্তিকদের বিশ্বাসের সঙ্গে তাদের এই বিশ্বাসের কোনো পার্থক্য আছে? বরং নাস্তিকরা এটা করে বাঙালি সংস্কৃতির নামে আর তারা করে ইবাদত হিসেবে। এটা কি ধর্ম বিকৃত নয়?

৮. মু‘জেযার দাবি ও আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যারোপ

এতকিছু করেও হেযবুত তওহীদের লোকেরা ক্ষান্ত হয়নি; বরং পন্নী সাহেব ২০০৮ সালে উদ্ভট কিছু বানোয়াট ঘটনার প্রেক্ষিতে নিজের জন্য মু‘জেযার দাবি করে বসেন। পন্নী সাহেবের ১০ মিনিটের একটি ভাষণ চলাকালীন নাকি সেই মু‘জেযা ঘটেছিল। সময়ের সংক্ষিপ্ততায় আমরা সে মুজেজা বিস্তারিত উল্লেখ করছি না। এখানে কেবল এতটুকু বলে রাখছি যে, মুসলিম মাত্রই জানেন, নবি-রাসুল ছাড়া অন্য কারো হাতে মু‘জেযা প্রকাশ পাওয়া সম্ভব নয়। আর সর্বশেষ নবি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের মধ্য দিয়ে সেই ধারা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর আর কোনো নতুন নবি আসবেন না। তাই এখন কারো জন্য মু‘জেযার দাবি করা সুস্পষ্ট গোমরাহী ও কুফর।  তাছাড়া যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে মু‘জেযার দাবি করা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, পুরো ঘটনাটা ছিল তাদের সাজানো নাটকমাত্র। [হেযবুত তওহীদের মুজেজার স্বরূপ জানুন এই প্রবন্ধে https://url-shortener.me/652H ]

অথচ পন্নী সাহেব কেবল এই মু‘জেযার দাবি করেই বসে থাকেননি; বরং তিনি আরো আগ বেড়ে সরাসরি আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যারোপ করে বলেছেন– মোজেজার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তিনটি বিষয় সুস্পষ্ট করেছেন। ১. হেযবুত তওহীদ হক্, ২. এমাম হক্ এবং ৩. হেযবুত তওহীদ দিয়ে সত্যদীন প্রতিষ্ঠিত হবে।” (দ্র. আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৬৫) অর্থাৎ এখন থেকে হেযবুত তওহীদের নামে যা বলা হবে, হেযবুত তওহীদের এমাম যা কিছু বলবেন, সব সত্য বলে মেনে নিতে হবে। নাউযুবিল্লাহ। যদি কেউ সত্য না মানে, তবে নবিদের মুজেযা অস্বীকার করলে যে শাস্তি ভোগ করত, সে শাস্তি ভোগ করবে। তাদের কোনো মুক্তি নেই। এমনকি সে মুনাফিকও। (আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা: ৬৪)

আল্লাহ তাআলা এরকম মিথ্যাচারকারীদের ব্যাপারে হুঁশিয়ারী দিয়ে ইরশাদ করেছেন–

وَ مَنْ اَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرٰی عَلَی اللهِ كَذِبًا اَوْ قَالَ اُوْحِیَ اِلَیَّ وَ لَمْ یُوْحَ اِلَیْهِ شَیْءٌ. ঐ ব্যক্তি থেকে বড় জালেম আর কে আছে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করে, অথবা বলে, আমার নিকট ওহী করা হয়েছে, অথচ তার নিকট কোনো কিছু ওহী করা হয়নি। –সূরা আন‘আম: ৯৩

পরিশেষে পন্নী সাহেবের এই মু‘জেযা সম্পর্কে তার ও তার দলের লোকদের আকীদা কী, তা বোঝার জন্য আমরা এখানে তাদের কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরছি–

হেযবুত তওহীদের বর্তমান এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম সাহেব লিখেছেন– “এমামের এই ঐতিহাসিক ভাষণ লক্ষ্য কোরলে বোঝা যায় যে এটা মহান আল্লাহর বাণী যা তিনি মাননীয় এমামুয্যামানের মুখ দিয়ে বোলিয়েছেন। আমরা যেন আল্লাহর এ বাণী হৃদয়ঙ্গম কোরতে পারি তাই তিনি এই মহা-গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের সময়ে চৌদ্দশ’ বছর পরে আবার মো’জেজা ঘটালেন।” (দ্র. আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৮১)

পন্নী সাহেব নিজেও তার মু‘জেযা সম্পর্কে বলেছেন– “এর চেয়ে বড় রহমত আর কি হোতে পারে? যে মো’জেজা তিনি নবীদের সময়ে ঘটাতেন একটা ‎একটা কোরে, এখন তিনি নিজে এক সাথে ৮টা মো’জেজা ১০ মিনিটের মধ্যে ঘোটিয়ে দিলেন।” ‎‎(দ্র. আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা, পৃ. ৬৭)

এভাবে একের পর এক হেযবুত তওহীদের লোকেরা যেন কুফর ও ভ্রান্তির পসরা সাজিয়ে বসেছে। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ খুব কম বিষয়ই এমন আছে, যেগুলোতে তারা কোনো ধরনের বিকৃতি বা কটুবাক্য ব্যবহার করেনি। আল্লাহ তাআলা, কুরআন কারিম ও নবিদের ব্যাপারে বেয়াদবিমূলক কথাবার্তা বলা, রাসুলের শানে গোস্তাখি করা, হাদীস অস্বীকার করা, ফেরেশতাদের ব্যাপারে বিকৃত আকীদা পেশ করা, সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহীনের মন্দ সমালোচনা করা—এভাবে হিসেব করতে গেলে তাদের কুফুরি আকিদা ফিরিস্তি অনেক লম্বা।

দাওয়াতের কৌশল

সর্বশেষ সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার কিছু কৌশল বলি। ১. হেযবুত তওহীদ তাদের মতবাদ প্রচারের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে থাকা সহজসরল নারীদের বেছে নেয় এবং তাদের মাধ্যমেই একটা পরিবার টার্গেট করে এগুতে থাকে। ২. দ্বিতীয়ত উলামায়ে কিরামের সমালোচনা করে। তাদের ধর্মব্যবসায়ীসহ আরো জঘন্যসব উক্তি করে থাকে। এটা জনসাধারণকে ধোঁকা দেওয়ার বড় একটি অপকৌশল। কেননা সাধারণ মানুষকে আলেমদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই তাদের কুফুরি কথা বিশ্বাস করাতে সহজ হবে। এ জন্যই কারো সঙ্গে পরিচয় হওয়া মাত্রই তারা সর্বপ্রথম উলামায়ে কিরাম সম্পর্কে মিথ্যাচারসম্পন্ন বই ‘ধর্ম ব্যবসার ফাঁদে’ দিয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে সব তাদের মনগড়া কথা ও আয়াতের ব্যাখ্যা। যে ব্যাখ্যার সঙ্গে সাহাবা, তাবেয়িন কিংবা সালাফদের বক্তব্যের কোনো সম্পর্ক নেই। ৩. কথার মারপ্যাচ। তারা অনেকগুলো ভালো ভালো কথার মাঝে দুয়েকটা ভ্রান্তমূলক কথা ঢুকিয়ে দেয়। কিংবা কুফুরী মতবাদগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে, সরলমনা মুসলমান তা ঠিক ধরতে পারেন না। ফলে তাদের কথায় প্রভাবিত হয়ে যায়। বিষয়টা বোঝার জন্য আমরা একটি উদাহরণ টানছি। ‘সব ধর্মের লোকেরাই জান্নাতে যেতে পারবে’ এমন ভ্রান্ত মতবাদকে বাস্তবায়ন করার জন্য ‘দৈনিক দেশেরপত্র সংকলন, সংখ্যা– ২৪’-এর ২৫ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে– “এখানেই প্রশ্ন, এসলামের শেষ সংস্করণ এসে যাওয়ার পরও এসলাম গ্রহণ না করে, পূর্ববর্তী বিশ্বাসে স্থির থেকে কেউ কি স্বর্গে যেতে পারবেন? এর জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ, অবশ্যই তাদেরও জান্নাতে যাওয়ার পথ খোলা আছে। এক্ষেত্রে শর্ত হলো, তাদেরকে শেষ নবী ও শেষ গ্রন্থ কোর’আনকে সত্য বোলে বিশ্বাস কোরতে হবে।”

যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, উপরোক্ত কথার প্রথম অংশ দ্বিতীয় অংশের সম্পূর্ণ বিপরীত। শেষ নবি ও কুরআনকে বিশ্বাস করে কারো পক্ষে পূর্ববর্তী বিশ্বাসে স্থির থাকা সম্ভব নয়। আবার পূর্ববর্তী ধর্মে বহাল থেকে কারো জন্য আখেরি নবি ও কুরআনের প্রতি ঈমান আনাও সম্ভব নয়। অথচ এভাবে কথার মারপ্যাঁচেই তারা সরলমনা মানুষদের ধোঁকা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া কুরআন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা, জাল হাদিসের আশ্রয় গ্রহণ ও ইতিহাস বিকৃতিও এ মতবাদ প্রচারের বড় এক হাতিয়ার।

সর্বশেষ তাদের ধোঁকা বুঝাতে তাদের উল্লেখিত একটি জাল হাদিস বলছি। পন্নী সাহেব তার ‘এ ইসলাম ইসলামই নয়’ নামক বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন– “রসুলাল্লাহ (দ.) একদিন আসরের নামাযের পর হঠাৎ পূর্ব দিকে চেয়ে খুশী হয়ে হাসলেন। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন তিনি অমন করে হাসলেন কেন? জবাবে বিশ্বনবী (দ.) বললেন- ভবিষ্যতে ইসলাম বিকৃত হয়ে যাবার পর হিন্দের (ভারতের) পূর্বে একটি সবুজ দেশ থেকে প্রকৃত ইসলাম পুনর্জীবন লাভ করবে।” এটা এমন এক বানানো হাদিস, যার তালিকা জাল হাদিসের কিতাবগুলোতেও নেই। আর সামান্য চিন্তা করলেওতো এটা যে হাদিস না, তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা রাসুলের যামানায় ভারতের পূর্বে আলাদা সবুজ কোনো দেশের অস্তিত্বই ছিল না; বরং তখন বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলটাকেই ‘হিন্দ’ বলা হত। মানুষ যেন এই জাল হাদিস বুঝতে না পারে, তাই পন্নি সাহেব কোনো সুত্রও উল্লেখ করেন নি।

যাইহোক: আমরা প্রত্যেকে হেযবুত তওহীদের ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তুলব। বিশেষত আমাদের মহিলাদেরও বিষয়টি অবগত করাবো। যেন তারা তাদের কুফুরি বুঝতে পারেন এবং ঈমানহীন এ মতবাদ গ্রহণ থেকে সতর্ক থাকতে পারেন। আমিন।



Leave a comment