শিয়াদের প্রধান তিনটি হাদিসের কিতাব ও একটি পর্যালোচনা

শিয়াদের সঙ্গে আমাদের মৌলিক সব বিষয়েই পার্থক্য রয়েছে। এমনকি পার্থক্য আছে হাদিস ও হাদিস গ্রন্থের। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতে হাদিস সাহাবাদের মধ্যস্থতায় বর্ণিত রাসুলের বাণী। কিন্তু শিয়ারা সাহাবাদের কাফের ও অগ্রণযোগ্য মনে করে, তাই তাদের বর্ণিত হাদিস গ্রহণ না করে ইমামদের হাদিস একমাত্র শিয়া রাবি বা বর্ণনাকারীদের সূত্রেই বর্ণনা করে। বিধিবিধান বর্ণনাও করে ইমামদের থেকে। রাসুল থেকে গ্রহণ করে কেবল আহলে বাইতের ফযিলত সংক্রান্ত হাদিস। আমাদের যেমন উসুলে সিত্তা বা মৌলিকৈ ছয়টি হাদিসের কিতাব রয়েছে; তেমনই শিয়াদেরও উসুলে আরবায়া বা মৌলিক চারটি কিতা রয়েছে। আমাদের ছয় কিতাব সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে নাসায়ি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযি ও সুনানে ইবনে মাজা আর শিয়াদের চার কিতাব হলো আল কাফি, তাহজিবুল আহকাম, আল ইস্তিবসার ও মান লা ইয়াহজারুহুল ফকিহ। উসুলে সিত্তার মধ্যে আমরা যেমন সহিহুল বুখারি ও সহিহ মুসলিম—কিতাবদ্বয়কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ জ্ঞান করি, শিয়ারাও উসুলে আরবায়া থেকে আল কাফি ও তহজিবুল আহকামকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদাণ করে। এ ছাড়া শিয়াবাদের উপর লেখিত সর্বপ্রথম গ্রন্থ সুলাইম ইবনে কায়েস হেলালি কিতাবকেও বেশ সম্মানীত ও গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান করে। আজ এই তিন মৌলিক হাদিসের কিতাব সম্পর্কে সামান্য পর্যালোচনা করব ইন শা আল্লাহ।

আল কাফি

প্রসঙ্গিক সর্বপ্রথম আল কাফি দিয়েই আলোচনা শুরু করছি। কিতাবটির লেখক আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব কুলায়নি (মৃত্যু: ৩২৯ হি.)। যিনি ১৯ বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমের পর কিতাটি সংকলন করেন। এবং এ কিতাবে তিনি কেবল সহিহ হাদিসই উল্লেখ করেন। শিয়াদের ১২তম ইমাম—ইমাম মাহদির প্রথম গায়বাত বা অদৃশ্যকালীন সময়ে এ কিতাবটি তার কাছে পেশ করা হলে তিনি বলেছিলেন: الكافى كافي لشيعتنا অর্থাৎ কাফি কিতাবটি আমাদের শিয়াদের জন্য যথেষ্ঠ। যেহেতু এটা তাদের নিস্পাপ ইমামকতৃক স্বীকৃত, তাই এর মর্যাদা কেমন হতে পারে; তা উপলব্ধ। এ কিতাবে বর্তমান ১৬১৯০টি হাদিস রয়েছে। এই হলো কিতাবের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। এখন আসি মূল আলোচনায়।  

মূলত আমাদের মুহাদ্দিসগণ যেমন হাদিস সংগ্রহ করেছেন, তেমনই রাবিদের জরাহ, তাদিল তথা সমালোচনা ও প্রশংসা করেছেন। এবং হাদিস গ্রহণযোগ্য না অগ্রহণযোগ্য—সে হুকুমও লাগিয়েছেন। অথচ শিয়াদের হাদিসের কোনো হুকুমই লাগানো হয়েছিল না। হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শিয়া আলেম—আল্লামা হিল্লির (মৃত্যু: ৭২৬ হি.) আগে আল কাফিতেই যে জাল ও দুর্বল হাদিস রয়েছে; তাই তাদের জানা ছিল না। তিনি হাদিসগুলোকে সহিহ, মুওয়াসসাক, হাসান ও যয়িফ—এই চারভাগে বিভক্ত করেন। অর্থাৎ তাদের হাদিসের মূলনীতিই শুরু হয় সপ্তম শতাব্দীর পর। অবশ্য যখন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের হাদিস সংকলনের সঙ্গে সঙ্গে রাবিদের জরাহ তাদিলের ধারা শুরু হয় এবং শিয়া রাবিদের সিংহভাগকে হাদিস জাল করার কারণে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাদের বর্ণিত হাদিস প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখন তারা নিজেদের সেসব রাবিদের জীবনী সংকলন শুরু করে তাদের ব্যাপারে আলাদা হুকুম লাগানো শুরু করে। কিন্তু মূলনীতিগত এই দুর্বলতা—এটাই একটা গোষ্ঠীর হাদিস শাস্ত্রের স্বরূপ অনুধাবন করিয়ে দেয়। এ দুর্বলতা আড়াল করতেই হাল যমানার ইরাকি আলেম জাফর সুবহানি ‘উসুলুল হাদিসি ওয়া আহকামিহি ফি ইলমিদ-দিরায়া’—গ্রন্থে হাকিম আবু আবদুল্লাহ নাইসাপুরি রহ.-কে সর্বপ্রথম শিয়া নকদের ইমাম সাব্যস্ত করেন। অথচ নাইসাপুরি রহ. এর উস্তাদ ও ছাত্র সবই সুন্নি। আর তিনিও কেবল আলি রাদি.-কে শাইখাইনের উপর প্রাধা্ন্য দিতেন।

যাইহোক, কুলায়নি যে আল কাফি কিতাবে সব সহিহ হাদিসের সমাহর ঘটিয়েছে, অথচ এগারো শতাব্দির আলেম মোল্লা বাকের মাজলিসি সে কিতাবের হুকুম লাগাতে গিয়ে নয় হাজারের উপর দুর্বল ও জাল সাব্যস্ত করেছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি। এই কাফি কিতাবেরই দুর্বলতা বুঝাতে একটা উদাহরণ দিই। তবেই আপনারা এ কিতাবের হাকিকত বুঝতে পারবেন।  

রওযাতুল জান্নাত ফি আহওয়ালিল উলামা ওয়াসসাদাত গ্রন্থের ৬/১১৪ পৃ. রয়েছে যে, আবু জাফর তুসি –যিনি ৪৬০ হিজরি ইন্তেকাল করেন—তিনি স্বীয় গ্রন্থ আল ফিহরিস্তের মধ্যে লেখেন যে, আল কাফিতে মোট ত্রিশটি কিতাব তথা ত্রিশটি অধ্যায় রয়েছে। আর হুসাইন বিন সায়্যিদ হায়দার ১০৭৬ হিজরি ইন্তেকাল করেন। তিনি বলেন আল কাফির মধ্যে মোট ৫০টি কিতাব রয়েছে। যার সবগুলোর সনদ ইমাম পর্যন্ত মুত্তাসিল বা ধারাবাহিক পৌঁছেছে। এ কথা দ্বারা সুস্পষ্ট যে, ৪৬০ হিজরি থেকে ১হাজার হিজরি তথা ৫০০ বছরের মধ্যে এ কিতাবে বিশ অধ্যায় সংযোজন করা হয়েছে। অন্যান্য হাদিসের মতো সংযোজিত হাদিসগুলোর সনদও লেখক থেকেই শুরু হয়েছে। অথচ এই বৃদ্ধিকৃত ২০ অধ্যায় এখন অবধি কোনো শিয়া আলেম নির্ধারণ করতে পারে নি। ১ হাজার হিজরির পর আরো ৪০০ বছর অতিবাহিত হতে চললো! এতেই সুস্পষ্ট বুঝা যায় তাদের হাদিস শাস্ত্র ও নকদের ইলম কতটা ঠুনকো।

তাহজিবুল আহকাম

শিয়াদের দ্বিতীয় বিশুদ্ধ গ্রন্থ তাহজিবুল আহকাম। বর্তমান শিয়া আলেমদের মতে তাহজিবুল আহকামে মোট ১৩৫৯০ টি হাদিস রয়েছে। তাহজিবুল আহকামের লেখক শায়েখ তুসি ইদ্দাতুল উসুল-এর 137-38 পৃ. লেখেন যে, আমি তাহজিবুল আহকামে পাঁচ হাজারের থেকে কিছু বেশি হাদিস লেখেছি। লক্ষ্য করুন, লেখক বলেছেন তার লেখিত হাদিসসংখ্যা ৫ হাজারের কিছু বেশি। সে কিতাবেরই বর্তমান হাদিস সংখ্যা  ১৩৫৯০। অর্থাৎ সাড়ে আট হাজার হাদিস অতিরিক্ত। মূল কিতাবের দেড়গুন বেশি। এই হাদিসগুলো কোথার থেকে এলো আর কে লেখল? এটাওতো আজ অবধি নির্ধারিত হয় নি! শিয়াদের প্রধান দুটো হাদিসের কিতাবের হালাতই যদি এই হয়, তবে বাকি কিতাব ও তার বর্ণনাগুলো কতটুকু সহিহ আর কতটুকু মজবুতির সঙ্গে সংরক্ষিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সত্য গোপনের হাস্যকর উপখ্যান

এখন একটা গল্প বলি। সত্য লুকানোর মজার গল্প। তাহজিবুল আহকামের এসব গড়মিল সম্পর্কে আমি সর্বপ্রথম সাইয়েদ হুসাইন মুসাবির কাশফুল আসরার গ্রন্থে তথ্য পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে ইন্টারনেটে ‘তানযিহুশ শিয়াতিল ইসনা আশারিয়া আনিশ-শুবহাতিল ওয়াহিয়্যাহ’—নামক একটি কিতাব খুঁজে পাই। যেটা লেখা হয়েছে শিয়া ইসনা আশারিয়ার উপর আনিত আপত্তি ও অভিযোগের জবাবে। লেখক ইমাম খোমিনিসহ ইরাক ও ইরানের বড় বড় স্কলারদের ছাত্র। নাম আবু তালেব তাযলিল তাবরিসি। আফসোসের বিষয় এতো বড় স্কলার হয়েও তার সত্য গোপন করতে হয়। অসত্যের আশ্রয় নিতে হয়। ইনসাফমূলক কথা বলার সৎ সাহস অবধি তার নেই। একেতো কিতাবে রয়েছে প্রচুর বৈপরিত্ব, তার উপর ১/২১০ পৃ. তাহজিবুল আহকামের হাদিস সম্পর্কিত তথ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। তিনি তাহজিবুল আহকামের হাদিস সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ করে উত্তর প্রদাণ করেন যে, أقول: لقد تتبعت كتاب عدة الأصول فلم أجد ذلك فيه! আমি শায়খ তুসির লেখিত ইদ্দাতুল উসুল কিতাবে এই তথ্য তালাশ করেছি, কিন্তু পাই নি। এরপর তিনি এ কথা সে কিতাবে থাকতে পারে না—সে সম্পর্কে যুক্তি উত্থাপন করেন। অথচ তিনি এই কিতাবের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ‘খবরে ওয়াহেদের উপর আমল সম্পর্কে লেখকের মাজহাব’—অনুচ্ছেদটি ভালোমতো পড়লেই তথ্যটি পেয়ে যেতেন। বিশেষত ১৩৭-৩৮ পৃ.।

সুলাইম বিন কায়েস হেলালি

এখন দেখব শিয়াবাদের উপর লেখিত প্রথম কিতাব সুলাইম বিন কায়স হেলালির শুদ্ধতা। শিয়া ঐতিহাসিক, মুহাদ্দিস ও রিজালশাস্ত্রবিদদের দাবিমতে সুলাইম বিন কায়েস আলি রাদি., হাসান রাদি., হুসাইন রাদি., যয়নুল আবেদিন ও ইমাম বাকেরের সাহাবি। এবং এই কিতাবের সিংহভাগ হাদিসই লেখা হয়েছে সালমান ফারসি, আবু যর গিফারি, মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ ও আলি রাদি. থেকে। সে ব্যক্তি সাহাবায়ে কিরামকে মিথ্যা প্রমাণ, রাসুলের হাদিসকে জাল সাব্যস্তকরণ ও কুরআনকে বিকৃতি সাধনের জন্য আলি রাদি. থেকে এ হাদিসও বর্ণনা করেছে যে, আমি আমিরুল মুমিনিনকে বলালম; সালমান ফারসি, মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ ও আবু যর গিফারিদের থেকে আমি এমনসব হাদিস ও কুরআনের তাফসির শুনতে পাই, যা অন্যদের থেকে বর্ণিত এবং প্রচলিত তাফসির ও হাদিসের থেকে ভিন্ন। আবার আপনার থেকে সালমান, আবু যর ও মিকদাদদের থেকে বর্ণিত বিষয়ের সত্যায়ন পাই। তখন আলি রাদি. সাহাবাদের বর্ণিত কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে বলেন: তারা নাসেখ মানুসুখ সম্পর্কে জানে না, রাসুলের যুগেই মিথ্যা হাদিস বানাতো। তাই রাসুল তাদের স্থান জাহান্নাম বলে সতর্ক করেছেন। এরপর আলি রাদি. সাহাবাদের থেকে বর্ণিত হাদিস, তাফসির ও কুরআনকে চারভাগে বিভক্ত করেন। ১. মুনাফেকদের বর্ণনা, ২. রাসুল থেকে একটা বিষয় শুনে ভুল বুঝে সেটা প্রচার করা ৩. যে হুকুম শুনেছিল সেটা মানসুখ হয়ে গেছে কিন্তু তারা জানে না। ৪. যারা কোনো মিথ্যার আশ্রয় নেয় নি বরং ভয় ও তাকওয়া থেকে সবকিছু যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেছে। অর্থাৎ আলি, সালমান, মিকদাদ ও আবু যর রাদি.। এ বর্ণনাটি সুলাইম বিন কায়েস গ্রন্থের সূত্রে শিয়াদের সব হাদিসের কিতাবেই উল্লেখ হয়েছে।

সুলাইমের হাকিকত

মূলত সুলাইম বিন কায়েস ব্যক্তিটাই কাল্পনিক। যার কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল না। কেননা তাকে মানুষ জেনেছে একমাত্র আবান ইবনে আবি আইয়াশের মাধ্যমে। অর্থাৎ সুলায়মকে আবান ইবনে আবি আইশ ছাড়া আর কোনো রাবি চিনে না। অখচ আবান ইবনে আবি আইয়াশ সম্পর্কে আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, ইয়াহইয়াহ ইবনে সাঈদ আল কাত্তান, শুবা ইবনুল হাজ্জাজ, আইয়ুব সাখতিয়ানি, আহমাদ বিন হাম্বল, ইয়াহইয়াহ ইবনে মাঈন, ইমাম নাসায়ি, ইমাম মিযযি, হাকিম নাইসাপুরি, দারাকুতনি, ইবনে হিব্বান, ইবনে  হজর আসকালানি, হাফেয যাহাবিসহ রিজালের সমস্ত ইমাম একমত যে, সে মিথ্যাবাদী ও মাতরুক অর্থাৎ পরিত্যাক্ত রাবি। তার ব্যাপারে সালাফদের মনোভাব বুঝার জন্য শত শত উক্তি থেকে একটা উক্তি উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি। আল কামিল ফিদ-দুয়াফায় গ্রন্থে শুবা রহ. থেকে এ উক্তি নকল করা হয়। তিনি বলেন: আমার কাছে সত্তরবার যেনা করাও সহজ আবানের সুত্রে হাদিস বর্ণনা করা থেকে।  তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য আল কামেল ফিদ দুয়াফা, তাহজিবুল কামাল, তাহজিবুত তাহজিব, আল জারহু ওয়াত তা’দিল লি ইবনি আবি হাতিম, ইকমালু তাহজিবিত তাহজিব দেখা যেতে পারে।

এটা শুধু সুন্নি আলেমদেরই মত না। বরং শিয়া মুহাদ্দিসরাও তাকে দুর্বল বলেছেন এবং সেই সুলাইম বিন কায়েস হেলালি নামক কিতাব লিপিবদ্ধ করেছে মর্মে অভিযোগ করেছে। দেখুন শিয়াদের রিজালের কিতাবে আবান ও সুলায়মের ব্যাপারে কি লিখেছে: শায়েখ তুসি রিজালুত তুসির ১২৬ পৃ. (রাবি নং: ১২৬৫)  লেখেন: আবান দুর্বল রাবি। একই তথ্য এসেছে: মাজমাউর রিজাল: ১/১৬, রিজালে ইবনে দাউদ: ৪৬০ ও রিজালু আল্লামাতিল হিল্লি ৩/২০৬। এমনকি মাজলিসি আল ওজিজ ফির রিজালের ১/১১ পৃ. এ কথা বলেছে। অর্থাৎ শিয়া রিজালবিদ সবাই একমত আবান ইবনে আবি আইয়াশ দুর্বল রাবি। শায়েখ মুফিদ তাসহিহু ই’তিকাদিল ইমামিয়্যাহ গ্রন্থের ১৪৯ পৃ. লেখেন: সুলায়ম ইবনে কায়েস হেলালি কিতাবটি অগ্রহণযোগ্য। কেননা এটা আবান ইবনে আবি আইশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর তার মধ্যে প্রতারণা বিদ্যমান। তাই এই কিতাবের হাদিস অন্ধভাবে গ্রহণ না করে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া, যেন তারা সঠিক ও অসঠিকের মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে দেন। 

হিজরি ৪র্থ ও ৫ম হিজরির অন্যতম শিয়া মুহাদ্দিস আহমাদ বিন হুসাইন আল গাযায়িরি—যিনি ইবনুল গাযায়িরি নামে প্রসিদ্ধ— শিয়াদের জরাহ তাদিল অর্থাৎ রাবিদের সমালোচনা ও প্রশংসার বড় ইমামদের একজন। তিনি তার প্রসিদ্ধ রিজালের কিতাব ইবনুল গাজায়িরির ৩৬ পৃ. আবান ইবনে আবি আইয়াশ সম্পর্কে লেখেন: সে দুর্বল রাবি, তাকে গুরুত্ব দেওয়া যায় না বা তার বর্ণার দিকে খেয়াল করা যায় না। আমাদের মুহাদি্দসগণ তার দিকে সুলাইম ইবনে কায়েস কিতাব লেখার বিষয়টি সম্পৃক্ত করেছেন। একই তথ্য রয়েছে মাজমাউর রিজাল ১/১৬ পৃ.। এরপর ইবনুল গাজায়িরি তার কিতাবের ৬৩ পৃ. সুলাইমের আলোচনা করতে গিয়ে লেখেন: শিয়া মুহাদ্দিসগণ বলেন: সুলাইম অপরিচিত। তার থেকে কোনো হাদিস বর্ণিত হয় নি। আমি অনেক কিতাবেই তার আলোচনা পড়েছি, কিন্তু কোথাও আবান ইবনে আইয়াশের সুত্র ছাড়া পাই নি। ইবনে উকদা রিজালু আমিরিল মু’মিনিন কিতাবে লেখেন: সুলাইমের নামে লেখিত কিতাব জাল। আর সুলাইম এমন ব্যক্তি, যার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা যায় না। একই তথ্য এসেছে মাজমাউর রিজালের ৩/১৫৭ পৃ., রওজাতুল জান্নাতের ৪/৬৭ পৃ. নাকদুর রিজালের ২/৩৫৫ পৃ.। আল্লামা হিল্লি (৭২৬) খুলাসাতুল আকওয়াল গ্রন্থের ১৬২ পৃ. ইবনুল গাযায়িরির এই তথ্য উল্লেখ করেছেন। ইবনে দাউদ আল হিল্লি তার কিতাব রিজালু ইবনি দাউদের ২৪৯ পৃ. লেখেন: সুলায়ম ইবনে কায়স হেলালি কিতাবটি জাল ও বানোয়াট। কিতাবটি লিখেছে আবান ইবনে আবি আইয়াশ। আমি এটাকে বানোয়াট মনে করি।

সুলায়ম ইবনে কায়েস জাল বলার কিছু কারণ হলো এরমধ্যে কয়েকটি বিষয় এমন এসেছে, যা একটা বাচ্চাও বুঝবে যে তা মিথ্যা। যেমন, মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর তার পিতা আবু বকর রাদি.-কে খেলাফত বিষরে মৃত্যুকালে নসিহত করেছিল। অর্থাৎ আলি রাদি.খেলাফতের যোগ্য ছিলেন, কিন্তু তিনি সে খেলাফত ছিনতাই করেছিলেন।

মুহাম্মদ বিন আবু বকরকে শিয়ারা খুব প্রমোট করে। কেননা সে উসমান রাদি. এর হত্যায় বিদ্রোহিদের সঙ্গে ছিল। জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে আলি রাদি. এর সঙ্গে ছিল। মূলত মুহাম্মদ বিন আবু বকর লালিত পালিত হয়েছেই আলি রাদি. এর ঘরে। তার মা ছিলেন আসমা বিনতে উমাইস রাদি.। আবু বকর রাদি. এর ইন্তেকালের পর আসমা বিনতে উমাইস রাদি. এর বিবাহ হয় আলি রাদি. এর সঙ্গে। তখন মুহাম্মদ বিন আবু বকরের বয়স ২বছর। যেহেতু তিনি আলি রাদি. এর অধীনে লালিতপালিত হয়েছেন, তাই তার নামে শিয়ারা অসংখ্য হাদিস জাল করেছে। যেমন: মুহাম্মদ বিন আবু বকর বলেন: আমার পিতা আবু বকর আলি রাদি. এর খেলাফত না মানার কারণে কাফের ও জাহান্নামি।

সুলাইম ইবনে কায়েসে যে রয়েছে মুহাম্মদ বিন আবু বকর তার পিতার মৃত্যুকালে তাকে উপদেশ দিয়েছেন—অথচ তার বয়স তখন দুই বছর—এটা কি সত্য হতে পারে? আবার এ কিতাবে ইমাম ১৩ জনের কথাও রয়েছে। এগুলো সুস্পষ্টই শিয়াদের বিরুদ্ধে যায়। তাছাড়া ওমর রাযি. ফাতেমা রাদি. – এর ঘরে আগুন দিয়েছেন, তাকে লাথি মেরে পাজর ভেঙেছেন—এসব ঘটনার ভিত্তি এই কিতাবই। অথচ সে কিতাব ও তার লেখকের হালাত! এ কিতাবকে তাদের মুহাদ্দিসরা বানোয়াট বললেও আবার এর বিষয়বস্তু গ্রহণ করে। তাদের এক রিজালবিদ তো বলেই দিয়েছেন যে এ কিতাব জাল হলেও এর হাদিসগুলো বিশুদ্ধ। যে লোকের ভিত্তি নেই, তার হাদিস কিভাবে সাহিহ হয়? তাদের অধিকাংশ হাদিসের ভিত্তিও এই কিতাব। মূলত কিতাব ইয়াহুদি লেখুক আর খ্রিস্টান; কুরআন, হাদিস, সাহাবা –সর্বপরি ইসলামের বিরুদ্ধে গেলেই হলো, সেটাই বিশুদ্ধ। 

আমাদের আলোচনার সারমর্ম সুলইমের অস্তিত্ব এসেছে কেবল আবানের মাধ্যমে। আর আবান দুর্বল ও মিথ্যাবাদী। আর যে লোকটা মিথ্যাবাদী—সে একজনের নাম নিয়ে কিতাব লিখে দিলো আর সেটাকে সবাই বিশ্বাস করে নিলো এবং ৪ ইমামের সাহাবি দাবি করে তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিলো? তাকে গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করল, এটা কি হাস্যকর না?

সর্বশেষ আবুল কাসেম খোয়ির মতামত উল্লেখ করি। মুজামু রিজালিল হাদিসের ১/১২৯ পৃ. তিনি আবানকে দুর্বল লিখেছেন। এবং সেখানে তিনি আবান সম্পর্কে ইবনুল গাযায়িরির মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি সুলায়ম ইবনে কায়েস সম্পর্কে ৯ম খণ্ডে স্বতন্ত্র ২২৬ পৃ. থেকে ২৩৮ পৃ. তথা ১২ পৃ. আলোচনা করেছেন। রাবি নাম্বার ৫৪০১। তিনি ৯/২৩০ পৃ. লেখেন: সুলাইম ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য এবং মর্যাদাবান কেননা সে আমিরুল মু’মিনিন আলাইহিস সালামের সাহাবি। অর্থাৎ সে আলি রাদি. এর সাহাবি বিধায় তার মর্যাদা বেশি আর আবু বকর ওমর ও উসমানসহ সমস্ত সাহাবা—রাসুলের সাহাবা হওয়া সত্ত্বেও কাফের।

এরপর ইবনুল গাযায়িরি যে সুলাইমকে অপরিচিত ও বানোয়াট বলেছেন, খোয়ি সাহেব সরাসরি ইবনুল গাযায়িরির কিতাবকেই বানোয়াট বানিয়ে দিয়েছেন। অথচ শিয়াদের বড় নকদের ইমাম আল্লামা হিল্লি, ইবনে দাউদ, তাফরিশি ত—তারা কেবল গাযায়িরির উপর ভিত্তি করে এই হুকুম লাগিয়েছে। তাহলে তারা কেমন নকদের ইমাম হলেন যারা এই সামান্য বিষয়টিই নির্ধারন করতে পারলেন না? এর দ্বারাতো তাদের পুরো রিজালশাস্ত্রই প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত আমরা সুলাইমের প্রশ্নে না যাই, কেবল রিজালবিদদের আবানের মন্তব্যটা গ্রহণ করে নিই অর্থাৎ আবান ইবনে আবি আইয়াশ দুর্বল; আর এ বিষয়েই সমস্ত শিয়া মুহাদ্দিস একমত—তাহলে প্রশ্ন; একজন দুর্বল রাবির উপর ভিত্তি করে আপনি কিভাবে একটা কিতাব কিংবা একজন লোকের অস্তিত্ব সাব্যস্ত করেন? আবার সে লোককে নির্ভরযোগ্য দাবি করেন? এটা কেমন রিজাল শাস্ত্র? আর তাদের মুহাদ্দিসরা কেমন নাকিদ!?



Leave a comment