আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের অভিমত
(২য় পর্বের পর থেকে…. লিংক https://wp.me/pgP0Ho-3k)
শিয়াবাদের উদ্ভব সম্পর্কে শিয়া ছাড়া আহলুস সুন্নাহ ও অন্যান্যদের মতামত পাওয়া যায়। সবের সারমর্ম তিনটি অভিমত। আমরা এখন সে অভিমত ও সে সম্পর্কিত পর্যালোচনা উল্লেখ করব ইন শা আল্লাহ।
প্রথম অভিমত
এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ইবনে খলদুনের মত উল্লেখ করা যায়। তিনি শিয়া রাষ্ট্রের সূচনা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন: রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আহলে বাইত মনে করতেন যে, তারা ছাড়া কুরাইশদের অন্যকেউ খেলাফতের যোগ্য না।[1] এরপর তিনি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর যারা আলি রাদি. এর খেলাফত কামনা করতেন, যেমন যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আম্মার ইবনে ইয়াসির এবং মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদের নাম উল্লেখ করেন। অর্থাৎ ইবনে খলদুন বুঝাতে চেয়েছেন যে, শিয়ানে আলি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর তার খিলাফতের দাবি থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। কিছু প্রাচ্যবিদসহ আহমাদ আমিন[2], এবং শিয়া ঐতিহাসিক আহমাদ ইবনে আবু ইয়াকুব[3] এমন ধারণা করে থাকেন। যুবাইর ইবনে বাক্কার আল আখবারুল মুওয়াফফিকাত গ্রন্থে লেখেন: وكان عامّة المهاجرين وجلّ الأنصار لا يشكّون أنّ عليّاً هو صاحب الأمر بعد رسولاللّه সাধারণ মুহাজির ও আনসারদের অধিকাংশ মনে করতেন যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আলি রাদি. খলিফা হবেন। এক্ষেত্রে সবার ধারণার ভিত্তিতে উল্লেখ করলেও ইবনে খলদুন ও আহমদ আমিনই শিয়াবাদের সূচনা বুঝাতেই উল্লেখ করেছেন।
পর্যালোচনা
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর খলিফা কে হবেন, সে বিষয় কেউ কারো বিষয় ভাবতে পারেন, এটা মনের বিষয়। কিন্তু সর্বসম্মত একটা ফয়সালা হয়ে গেলে তখন সে ধারণার কোনো মূল্য থাকে না। তেমনই রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর অনেকেই নৈকট্যের কারণে আলি রাদি.-কে খলিফা ভাবতে পারেন, এমনকি খলিফা নির্ধারনী মজলিসে তার কথা উঠাতেই পারেন, এর অর্থ এই নয় যে, তার নাম প্রস্তাবকারী প্রত্যেকেই তার দলভুক্ত হয়ে গেছে। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন: وما انفصلوا حتى اتفقوا، ومثل هذا لا يعد نزاعا তারা মতের দিক থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করলেও একমত হয়ে গেলেন। যার পর আর কোনো মতভেদ বাকি থাকে না। অর্থাৎ যদি কোনো ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের অনুসারীরা সর্বশেষ একমত হয়ে যান, তবে পূর্বের মতভেদকৃত বিষয় কোনোভাবেই বিরোধ হিসেবে গণ্য হবে না। কাজেই সমস্ত সাহাবাই যখন আবু বকর রাদি. এর খিলাফতের উপর ঐক্যবদ্ধ হেয়ে গেল, তখন তাদের পূর্বের মতের ভিন্নতা তাদের মধ্যে বিভক্তি করা এবং একটা স্বতন্ত্র দলের অস্তিত্ব উৎপত্তি বলে সাব্যস্ত করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তাছাড়া আমরা এ মত তখনই গ্রহণ করতে পারতাম, যখন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুরে পর আলি রাদি.-কে কেন্দ্র স্বতন্ত্র একটি দল গঠিত হতো। অথচ আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, খোদ আলি রাদি.-ই আবু বকর রাদি এর অধীনস্ততা মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন না। এবং প্রথম তিন খলিফার যুগে শিয়া নামক কোনো দলের অস্তিত্বও ছিল না। যে কথা খোদ শিয়া আলেমরাও স্বীকার করেছেন। বিগত শতাব্দীর অন্যতম শিয়া আলেম আলে কাশেফুল গিতা আসলুশ শিয়াতি ওয়া উসুলিহা শায়খাইনের খেলাফতের প্রশংসার করে লেখেন: ….ولم يكن للشيعة والتشييع يومئذ مجال للظهور، لأن الإسلام كان على مناهجه القويمة…. আবু বকর, উমর ও উসমানের যুগে শিয়া ও শিয়াপন্থার প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। কেননা ইসলাম তখনও তার সঠিক ও সোজা পথে অটল ছিল।[4] আমরা যদি এ কথার উপর গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে বুঝতে পাই; প্রথম তিন খলিফার যুগে শিয়াবাদের কোনো উত্থানই ঘটে নি। এমনকি তার সম্ভাবনাও ছিল না। যদি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পূর্বে অথবা পরে আলি রাদি.-কে কেন্দ্র করে কোনো দলের সৃষ্টিই হতো; তবে হঠাৎই তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? এ চিন্তা বাতুলতা বৈ কিছুউ নয়। কেননা তখন সাহাবাদের যুগ। যারা নিজেদের দৃঢ় ঈমানের বদৌলতে অসংখ্য নির্যাতন সহ্য করা দলটাকেই নিশ্চিহ্ন করে দিবে? এরচেয়ে হাস্যকর কোনো কথা হতে পারে? কাজেই যারা দাবি করে রাসুলের যুগে কিংবা তার ইন্তেকালের পর শিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি; তাদের সে মত কেবল নিজেস্ব অভিমতই—বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই।
দ্বিতীয় অভিমত
শিয়াবাদের উদ্ভব হযরত উসমান রাদি. মৃত্যুর পর। এ মতের প্রবক্তা ইবনে হাজাম জাহেরি, উসমান ইবনে আবদুল্লাহ আল হানাফি ও প্রাচ্যবিদদের অন্যতম জুলিয়াস ভেলহাউজেন। ইবনে হাজাম বলেন: ثم ولى عثمان، وبقي اثني عشر عاما، وبموته حصل الإختلاف وابتدأ امر الروافض (উমর রাদি. এর পরে) উসমান রাদি. খেলাফতের মসনদে আসীন হলেন এবং বারো বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তার মৃত্যুর পর মতবিরোধ শুরু হয় এবং রাফেযিদের উদ্ভব ঘটে।[5]
তৃতীয় অভিমত
শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিস দেহলবি রহ. লেখেন: শিয়াবাদের সূচনা 37 হিজরি[6] জঙ্গে সিফফিনের পর তাহকিম বা সালিশির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়। মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ব্যাপাক ক্ষয়ক্ষতির পর আলি রাদি. ও মুয়াবিয়া রাদি. পরস্পর সালিশের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হন। তখন আলি রাদি. এর বাহিনী থেকে একদল লোক “ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ” তথা নির্দেশ মানতে হবে কেবল আল্লাহ তায়ালার, সালিশের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির নয়—বলে আলি রাদি. এর দল ত্যাগ করেন। সে থেকে এদের নাম হয় খারেজি বা (মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে যারা এর সাপক্ষে ছিল; তাদের কাফের ঘোষণা দিয়ে বিশৃঙ্খলার উদ্দেশ্যে আলি রাদি.-এর) দল পরিত্যাগকারী। পক্ষান্তরে যারা তখন আলি রাদি. এর বাহিনীতে থেকে গিয়েছিলেন; তাদের ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথম শিয়ানে আলি বা আলির দল—শব্দটি প্রয়োগ হতে থাকে।
প্রণিধানযোগ্য মত
ড. নাসির বিন আবদুল্লাহ আল কিফারি হাফি. তার পিএইচডি থিসিস ‘উসুলু মাযহাবিশ শিয়াতিল ইমামিয়াতিল ইসনা আশারিয়া আরদুন ওয় নাকদুন’-গ্রন্থে এই তিনটি অভিমতের মধ্যে দ্বিতীয় অভিমত তথা আবদুল্লাহ বিন সাবাকতৃক গঠিত উসমান রাদি. এর হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত দল-যা উসমান হত্যার পরই সামনে আসে—তারাই ইতিহাসের প্রথম শিয়া; যারা সাবায়ি নামে প্রসিদ্ধ ছিল—মতটি প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে তৃতীয় অভিমতটিই প্রণিধানযোগ্য। কেননা যদিও সাবায়িদের অস্ত্বিত্ব সর্বপ্রথম হয়েছিল; কিন্তু তখন তারা শিয়া হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল না। বরং ৩৭ হিজরি সালিশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন শিয়ানে আলি শব্দটির উদ্ভব হয়, তখন তারা তাদের কুফুরি প্রকাশের লক্ষ্যে আলি রাদি. ও আহলে বাইতের মুহাব্বতকে হাতিয়ার বানায়। অথচ আলি রাদি. এর বাহিনীতে সম্মানীত অনেক সাহাবি ও তাবেয়ি অংশগ্রহণ করেছিলেন। কাজেই ঢালাওভাবে সাবায়িদের তৎকালীন প্রথম শিয়া হিসেবে আখ্যা দিলে অন্যসব মুখলেস সাহাবা ও তাবেয়িদের একই কাতারে রাখা আবশ্যক হয়। অথচ সেকালের শিয়ানে আলির অন্তর্ভূক্ত সবাইকে একই পাল্লায় রাখার কোনো সুযোগ নেই।
[1] ইবনে খলদুন: ৩/২১৪
[2] ফজরুল ইসলাম: ২৬৬।
[3] তারিখে ইয়াকুবি: ২/১১৪।
[4] আসলুশ শিয়াতি ওয়া উসুলিহা: ১২৪ পৃ.।
[5] আরো দেখুন: জুলিয়াস ভেলহাউজেন: আল খাওয়ারেজ ওয়াশ শিয়া—জার্মান ভাষা থেকে আরবি অনুবাদ আবদুর রহমান বাদবি: ১৪৬ পৃ., উসমান ইবনে আবদুল্লাহ আল হানাফি: আল ফিরাকু ওয়াল মুতাফাররিকা বাইনা আহলিয যাইগি ওয়ায যিন্দিকা: ৬
[6] মুখতাসারু তুহফাতি ইসনা আশারিয়া: ৫


Leave a comment