(৩য় পর্বের লিংক: https://wp.me/pgP0Ho-4h)
১. মুখলিস শিয়া
এ স্তরে সেসব মুহাজির ও আনসার সাহাবি অন্তর্ভুক্ত যারা আলি রাদি.-এর সিদ্ধান্ত সঠিক বিবেচনা করে তার সঙ্গে জঙ্গে সিফফিনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী ৮০০ সাহাবি ছিলেন এবং ৩০০ সাহাবি শহিদ হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ তার সহচরদের গালি দেওয়া কিংবা কাফের বলাতো দূরের কথা কাউকে ছোট করেও দেখেন নি। হোক সে পক্ষের কিংবা বিপক্ষের। এক্ষেত্রে জঙ্গে জামালের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। কেননা উম্মুল মুমিনিন রাদি. এবং তলহা ও যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুমা; যদিও আলি রাদি. এর সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়েছিল, তবুও প্রত্যেকের মধ্যে ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। পরস্পর পরস্পরের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ও সজাগ ছিলেন।
মূলত এ যুদ্ধগুলো সংঘঠিত হয়েছিল উসমান হত্যায় অংশগ্রহণকারীদের ষড়যন্ত্রে। সাহাবারা কেউ পার্থিব কোনো স্বর্থ হাসিলের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন না। যদিও ধরে নেওয়া হয় যে, তারা ইচ্ছাকৃত যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, তবুও এটাতো নিশ্চিত যে, তাদের লড়াই করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
যাইহোক, আমরা সমস্ত পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য ছুড়ে ফেলে এসব মহান সাহাবি—যারা আলি রাদি. এর পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন; তারা ইখলাস ও দ্বীনের স্বার্থেই আনুগত্য করেছিলেন—আমরা এ বিশ্বাস পোষণ করি। এটাই আমাদের আকিদা। এসব সাহাবা ও তাদের অনুসারীদের সালাফগণ প্রথম শ্রেণির শিয়া বলে অবহিত করেছেন।
২. তাফযিলি শিয়া
তারা কোনো সাহাবাকে তাকফির, গালি কিংবা ঘৃণা প্রকাশ ছাড়াই আলি রাদি.-কে সমস্ত সাহাবার উপর প্রাধান্য দিতেন। যেমন নাহু শাস্ত্রের প্রণেতা আবুল আসাদ দুওয়ালি ও তার ছাত্র—বসরার কারি আবু সাঈদ ইয়াহইয়াহ ইবনে ইয়ামার, মুহাম্মদ আল বাকের ও জাফর সাদিক থেকে হাদিস বর্ণনাকারী আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক, মুসান্নাফ প্রণেতা আবদুর রাজ্জাক সানআনি এবং পরবর্তীকালীন কিছু সুফিরা।
এই দলটি আলি রাদি. এর খেলাফত পরবর্তী দু’তিন বছর পর প্রকাশ পায়। আলি রাদি. যখন জানতে পারেন যে, একদল লোক তাকে শায়খইনের উপর প্রাধান্য দিচ্ছেন; তখন তিনি নিষেধ করে দিয়ে বলেন যে, আমি যদি শুনতে পাই আমাকে পুনরায় কেউ শায়খাইনের উপর প্রাধান্য দিচ্ছে, তবে তাকে আমি মিথ্যার দণ্ডে দণ্ডিত করব। অর্থাৎ আশিটি বেত্রঘাত করা হবে, কেউ কেউ বলেন: ১০টি।[1]
অবশ্য ইবনে হাজার আসকালানি রহ. শিয়া সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন যে,
“التشيع في عرف المتقدمين هو اعتقاد تفضيل علي على عثمان، وأن عليا كان مصيبا في حروبه، وأن مخالفه مخطئ مع تقديم الشيخين، وتفضيلهما، وربما اعتقد بعضهم أن عليا أفضل الخلق بعد رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم ”
মুতাকাদ্দিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কিরামের মতে শিয়া তারা, যারা হযরত আলি রাদি.-কে হযরত উসমান উসমান রাদি.- এর উপর প্রাধান্য দেন এবং মুশাজারাত বা সাহাবাদের অন্তর্দ্বদ্বের ক্ষেত্রে আলি রাদি.-কে সঠিক ও বিরুদ্ধবাদীদের (ইজতিহাদি) ভুল মনে করেন। কিন্তু শায়খাইন তথা আবু বকর ও উমর রাদি.-দের সবার উপর প্রাধান্য দেন এবং শ্রেষ্ঠ মনে করেন। অবশ্য কেউ কেউ আলি রাদি.-কে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর সর্বশ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করত।[2] এরপর ইবনে হাজার রহ. এসব তাফযিলি শিয়া রাবিদের হাদিস গ্রহণ সম্পর্কে বলেন: তারা যদি পরহেজগার, সত্যবাদী ও মুজতাহিদ হন, সঙ্গে সঙ্গে এই মতবাদের প্রচারক না হন, তবে তাদের হাদিস গ্রহণ করতে কোনো সমস্যা নেই।
ইবনে তাইমিয়া রহ.-ও তাফযিলি শিয়া সম্পর্কে ইবনে হাজরের মতোই বলেছেন যে, তারা আবু বকর ও উমর রাদি.-দের আলি রাদি. থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তবে পার্থক্যের জায়গা হলো: তারা হযরত উসমান রাদি. উপর তাকে প্রাধান্য দিতেন। আর সেসময় রাফেযি ও ইমামি বলতে কেউ ছিল না।[3]
৩. শিয়া সাবায়ি
এদের তাবরিয়া নামেও ডাকা হয়। কেননা তারা সালমান ফারসি, মিকদাদ বিন আসওয়াদ ও আবু যর গিফারি ছাড়া সমস্ত সাহাবাকেই গালি দেয়। তাদের কুফর ও মুনাফেকির অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্নতার ঘোষনা দেয়। এরা এমন দাবিও করে যে, গদিরে খোম দিবসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি রাদি.- من كنت مولاه فعلى مولاه” তথা আমি যার মাওলা আলি তার মাওলা তথা আমি যার বন্ধু আলি তার বন্ধু—এটা বলে তার খেলাফতের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু রাসুলের ইন্তেকালের পর এই সাহাবিরা আলিকে খলিফা না বানানোয় সবাই ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।
হযরত আলি রাদি. প্রকাশ্যেই এদের থেকে মুক্ততা ঘোষণা করেন। ইমাম মুয়াইয়িদ বিল্লাহ হামযা আয-যায়দি ‘তুকুল হামামাহ ফি মাবাহিসিল ইমামাহ’ গ্রন্থের শেষদিকে সুয়াইদ ইবনে গাফলাহ রদি.-এর একটি বর্ণনা নকল করেন। সুয়াইদ রাদি. বলেন: আমি একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম যারা আবু বকর ও উমর রাদি.-দের গালি দিচ্ছিল। তাই আলি রাদি.-কে বিষয়টি জানিয়ে বললাম: তারা যদি মনে না করত যে, আপনি তাদের মতোই ধারণা পোষণ করেন, তবে তারা এ সাহস পেত না। এদের মধ্যে আবদুল্লাহ বিন সাবা অন্যতম। তখন আলি রাদি. বললেন: আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় কামনা করছি। আল্লাহ তাদের উভয়ের উপর দয়া করুন। এরপর তিনি আমার হাত ধরে মসজিদে নিয়ে গেলেন এবং মেম্বারে উঠলেন। তিনি তার সাদা দাড়ি মুঠ করে ধরেছিলেন। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝড়ছিল। তিনি ততক্ষণ অবধি নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন যতক্ষণ না লোকজন জড়ো হয়। এরপর তিনি খুৎবা শুরু করলেন এবং বললেন: কিছু লোক কিভাবে আমার দু ভাই, রাসুলের মন্ত্রী, তার সঙ্গী, কুরাইশদের নেতা ও মুসলমানদের পিতা সম্পর্কে এমন কথা বলে? আমি তাদের উক্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আর এ জন্য তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। তারা দুজন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও আল্লাহর কাজে পরিশ্রমের মাধ্যমে সঙ্গ দিয়েছেন। তারা আল্লাহর আদেশে আদেশ করতেন, নিষেধে নিষেধ করতেন আর তার সন্তুষ্টির জন্য রাগ করতেন। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উপর সন্তুষ্ট অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। মুসলমানগণও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিল। তারা নবির জীবদ্দশায় ও তার ইন্তেকালের পর কোনোভাবেই তার পথ ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন নি। তারা এ অবস্থায়ই ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি রহম করুন। সে সত্ত্বার কসম! যিনি দানা ফাটিয়ে অঙ্কুরিত করেন এবং প্রাণ সৃষ্টি করেন, তাদের দুজনকে কেবল মুমিনই ভালোবাসবে আর একজন হতভাগা বিদ্রোহিই তাদের ঘৃণা করবে। তাদের ভালোবাসা (আল্লাহর) নৈকট্য আর ঘৃণা (দ্বীন থেকে) বিচ্যুতি। … এরপর তিনি আবদুল্লাহ বিন সাবাকে ডাকেন এবং মাদায়েনে নির্বাসন দেন।[4] বুখারির বর্ণনায় রয়েছে: এ সময় তিনি আবদুল্লাহ বিন সাবার অনুসারিদের আগুনে জ্বালিয়ে দেন।[5] এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ শিয়া গ্রন্থের সূত্রে সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।
শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. শিয়াদের এ তিন স্তর ছাড়া শিয়া গুলাত নামে চতুর্থ আরেক স্তরের আলোচনা করেছেন। যারা আলি রাদি.-কে আল্লাহ বলত। মূলত এই চতুর্থ শ্রেণী সাবায়ি গ্রুপেরই অংশ। কেননা আবদুল্লাহ বিন সাবা—খোদ আলি রাদি.-কে আল্লাহ বলেছিল।
শিয়া দ্বারা উদ্দ্যেশিত স্তর
প্রথম যুগে শিয়া দ্বারা মুখলিস ও তাফযিলি শিয়াই উদ্দেশ্য হতেন। কিন্তু পরবর্তীতে সাবায়িরা যখন শিয়া উপাধি ধারণ করে, তখন প্রথম দু শ্রেণী আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সঙ্গে মিশে যান।[6] তখন থেকে শিয়া দ্বারা কেবল সাবায়িরাই উদ্দেশ্য হতে থাকে। যাদের আরেক উপাধি রাফেযি। এদের সম্পর্কেই ইবনে হাজার রহ বলেন: “وأما التشيع في عرف المتأخرين فهو الرفض المحض، فلا تقبل رواية الرافضي الغالي ولا كرامة” (মুতাকাদ্দিমীনদের যুগে শিয়া দ্বারা মুখলিস ও তাফযিলি শিয়া উদ্দেশ্য হলেও) মুতাআখখিরিনদের পরিভাষায় শিয়া বলতে কেবল চরমপন্থী রাফেযি উদ্দেশ্য। যাদের কোনো বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না। আর তাদের কোনো সম্মানও নেই।[7]
চলবে……
[1] মুখতাসারুত তুহফাতু ইসনা আশারিয়া: ৫
[2] ইবনে হাজার: তাহজিবুত তাহজিব: ১/৫৩
[3] ইবনে তাইমিয়া: মিনহাজুস সুন্নাহ: ২/৯২
[4] মুখতাসারুত তুহফাতু ইসনা আশারিয়া: ৬-৭ পৃ.
[5] সহিহ বুখারি: ৬৯২২।
[6] শাহ সাহেব রহ. বলেন: মুতাকাদ্দিমীন ও প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থে আহলুস সুন্নাহের অনেক আলেমের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তিনি শিয়া ছিলেন—এর দ্বারা উদ্দেশ্য তাফযিলি শিয়া। এসব কথা আপন স্থানে ঠিক আছে। … এর মাধ্যমে কেউ যেন প্রতারিত না হয়। কেননা তারা সাবায়িদের মতো ছিলেন না; কেবল আলি রাদি. এর সঙ্গে থাকায় শিয়ানে আলি উপাধি দেওয়া হয়েছে। তুহফায়ে ইসনা আশারিয়া (উর্দু): ৩৯-৪০।
[7] তাহজিবুত তাহজিব: ১/৫৩।


Leave a comment