রাফেযি ও সাবায়িদের পরিচয়

রাফেযিদের পরিচয়

(৩য় পর্বের লিংক: https://wp.me/pgP0Ho-4s)

আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

রাফেযি শব্দটি (الرَّفضُ) ক্রিয়ামূল থেকে এসেছে। অর্থ পরিত্যাগ করা। رَوافِضُ প্রত্যেক ওই সৈন্যদলকে বলা হয়, যারা তাদের সেনাপতিকে পরিত্যাগ করে।[1] পরিভাষায় রাফেযি বলা হয়: এমন এক চরমপন্থী শিয়া সম্প্রদায়কে (যারা ইয়াহুদি আবদুল্লাহ ইবন সাবা-র চিন্তাধারার প্রভাবে মধ্যপন্থী শিয়াপন্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে) অধিকাংশ সাহাবির প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করে, বিশেষত আবু বকর ও উমর রাদি.-দের খেলাফত বিষয়ে। তারা দাবি করে যে, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে খিলাফত আলী রাদি. ও তার বংশধরদের জন্য নির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল। সঙ্গে সঙ্গে অন্যকারো খিলাফত অবৈধ ও বাতিল বলে বিশ্বাস রাখে।[2]

রাফেযি নামের উদ্ভব

হিজরি ১২২ সালে যায়েদ বিন আলি বিন হুসাইন বিন আলি কুফার শিয়াদের থেকে বায়াত নেন। তখনকার কুফার গভর্ণর ইউসুফ বিন উমর বিষয়টি জানামাত্র সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেন। শিয়ারা এটা শুনে যায়েদ বিন আলিকে প্রশ্ন করে আবু বকর ও উমরের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন: আল্লাহ তায়ালা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। আমি আমার পরিবারের কাউকে তাদের থেকে সম্পর্কহীন হতে শুনি নি। আমিও তাদের সম্পর্কে ভালো ছাড়া বলছি না। …. তখন এসব শিয়ারা তার বায়াত ভঙ্গ করে তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। সে থেকে শিয়ারা রাফেজি উপাধিতে ভূষিত হতে থাকে।

সেকালের সাবায়ি পরবর্তীকালীন শিয়া রাফেযি

ইসলামের প্রথম ফিতনা সৃষ্টিকারী ও আকিদা বিকৃতকারী আবদুল্লাহ বিন সাবার অনুসারী সাবায়ি গোষ্ঠি ৩৭ হিজরির পর শিয়া নাম ধারণ করে। এরাই যায়েদ বিন আলিকে ডেকে তার সাহাবা মান্যতার কারণে তার বাইয়াত পরিত্যাগ করে। ফলে তখন থেকে শিয়া ও রাফেযি প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

সাবায়িদের পরিচয়

উদ্ভব

রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আল্লাহ তায়ালা তিন খলিফার হাতে ইয়াহুদি, খ্রিস্টান, অগ্নীপূজক ও মুশরিকদের ভূমি দান করে তাদের সম্মানীত করেন। সে সঙ্গে ওসব কাফেরদের হত্যা, বন্দি ও লাঞ্ছনার স্বাদ আস্বাদন করিয়ে তাদের কর দিতেও বাধ্য করেন। প্রথম দুই খলিফার খেলাফতকালে তারা যুদ্ধের ময়দানে খুব হম্বিতম্বি করলেও আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে তারা কোনো ক্ষতিই করতে পারে নি। পরে এই কাফেররা মুনাফেকের বেশ ধরার সিদ্ধান্ত নিলো। এবং এ উদ্দেশ্যেই তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রাদি. এর খেলাফতকালে বেশ কিছু কাফের ইসলাম গ্রহণ করল। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল আবদুল্লাহ বিন সাবা। যার দিকে সম্বোধন করে তার অনুসারিদের সাবায়ি বলা হয়।

আবদুল্লাহ ইবন সাবার পরিচয়

কেউ কেউ বলেন ইবনে সাবা ইরাকের হিরা শহরের অধিবাসী[3], কেউ বলেন রোমের অধিবাসী[4] আর কেউ বলেন ইয়ামানের সানআর অধিবাসী।[5] আর এটাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত। তিনি মূলত একজন ইহুদি ছিলেন—স্বীয় ধর্মাবস্থায় থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকাশ্য শত্রু। জন্মগতভাবেই ছিলেন ধূর্ত ও চক্রান্তকার। যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী এবং বিভেদ সৃষ্টিতে ছিল তার বিশেষ দক্ষতা।

ইসলামের আলো নিভিয়ে দেওয়ার দুরভিসন্ধিতে সে ৩২ হিজরিতে হযরত উসমান রাদি.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে, যেন মুসলমানদের সমাজে প্রবেশ করে ছদ্মবেশে নিজের বিকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে পারে। ইসলাম গ্রহণের পর সে কুফা, বসরা ও মিসরে গিয়ে তার দাওয়াত শুরু করে এবং তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান রাদি. এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানায়। কুফা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষই তার প্রচারে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়।

এরপর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা তার অনুসারীদের একত্রিত করে সে মদিনায় আসে এবং এমন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় যা কোনো মুসলমানের কল্পনাতেও স্থান পায় না। ফলস্বরূপ হযরত উসমান রাদি. শহিদ হন এবং হযরত আলি রাদি. খলিফা নিযুক্ত হন। সেই বহুরূপী মুনাফিক তখন নতুন মুখোশে আত্মপ্রকাশ করে—নিজেকে আলি রাদি.-এর অনুরাগী এবং ‘শিয়ান-এ-আলি’ তথা ‘আলির দল’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে।

উসমান রাদি. এর শাহাদাতের ষড়যন্ত্র সফল হওয়ায় সে ও তার অনুসারীরা দ্বিতীয় ধাপের পরিকল্পনা হাতে নেয়। লোকদের আহলে বাইতের ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, সত্য খলিফার প্রতি আনুগত্যের আহ্বান জানায় এবং অন্যদের কথাকে উপেক্ষা করতে উৎসাহ দেয়। এসব কথায় কোনো আপত্তির কারণ না থাকায় সাধারণ মানুষ ও শিক্ষিত শ্রেণি উভয়েই তা গ্রহণ করে, এবং তার প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে।

মানুষের মাঝে নিজের গ্রহণযোগ্যতা টের পেয়ে ইবন সাবা ঘোষণা করে বসে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটতম আত্মীয় হওয়ার কারণে আলি রাদি. রাসুলের পর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি রাসুলের চাচাতো ভাই ও জামাতা—এ যুক্তি দেখিয়ে সে আলির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে হযরত আলি রাদি. -সংক্রান্ত বিদ্যমান হাদিসের সাথে আরও বহু মিথ্যা হাদিস জুড়ে দিয়ে তা ছড়িয়ে দেয়।

যখন সে দেখে, মানুষ আলি রাদি. -এর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করছে, তখন তার অনুগতদের বলে, “আল্লাহর রাসুল স্পষ্টভাবে আলিকে তার ওয়াসি ও উত্তরসূরি মনোনীত করেছিলেন।” ……إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا[6]—আয়াতের অপব্যাখ্যা করে সে দাবি করে যে, এটি আলির খেলাফতের সাক্ষ্য বহন করে। এরপর সাহাবাদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটাতে থাকে যে, তারা ক্ষমতার লোভে নবীর নির্দেশ অমান্য করে আলির অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। 

অপরদিকে, ফাদাক[7] নিয়ে ঘটনার প্রসঙ্গে হযরত ফাতিমা রাদি. হযরত আবু বকর রাদি.-এর মাঝে সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি হলেও পরবর্তীতে তা মিটে গিয়েছিল। কিন্তু ইবন সাবা তার অনুসারীদের কাছে কেবল বিরোধপূর্ণ অংশটি প্রচার করে, প্রকৃত ঘটনা গোপন রাখে। সে তাদের বলে, “আমার নাম প্রকাশ করবে না; আমি খ্যাতি বা ধন চাই না—আমার উদ্দেশ্য কেবল সত্য প্রকাশ।” এই কথাগুলোই ছিল তার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

তার প্ররোচনায় আলি রাদি. এর বাহিনীর মধ্যেই পূর্ববর্তী খলিফাদের সম্পর্কে কটুক্তি ও অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করে। আলি রাদি. ঘটনা জানতে পেরে মিম্বারে উঠে প্রকাশ্যে এসব থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করেন।

কিন্তু সাবাপুত্রের ফেতনা তখনই মুসলমানদের আকিদায় গভীর শিকড় গেড়ে বসে। সে তার নির্বাচিত কিছু শিষ্যকে গোপনে বিশেষ শিক্ষায় দীক্ষিত করে বলে, “আলির কারামত, অদৃশ্য জ্ঞান, মৃতকে জীবিত করা, জগতের হাকিকত জানা, অদ্বিতীয় সাহস—এসব আল্লাহর গুণাবলী, যা মানবরূপে প্রকাশিত হয়েছে।” এরপর সে বলে, أن عليا هو الاله   ولا اله الاهو “আলিই মাবুদ, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।”

সে দাবি করে, আলি নাকি বলেছেন: “আমি অমর; কখনো মরব না। আমিই কবর থেকে মৃতদের উঠাব, আমিই কিয়ামত কায়েম করব।”

এ কথা শুনে হযরত আলি রাদি. তাদের ডেকে বলেন: “তোমরা যদি এসব থেকে তওবা না করো, আমি তোমাদের আগুনে পুড়িয়ে দেব।” যারা তওবা করেনি, তিনি সত্যিই তাদের আগুনে দগ্ধ করেন এবং ইবন সাবাকে নির্বাসিত করে মাদায়েন পাঠান। কিন্তু সেখানেও তার বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যেতে থাকে। বাহিনীতেও স্থান গেড়ে বসে তার সে বিভ্রন্ত আকিদা। আলি রাদি. যুদ্ধবিগ্রহে ব্যস্ততায় এদিকে পূর্ণ মনযোগ দিতে না পারায় তার বাহিনীই তিন স্তরে বিভক্ত হয়—যার আলোচনা ইতঃপূর্বে করেছি।[8]


[1] জাওহারি: আস-সিহাহ: ৩/১০৭৮, ফায়রুজাবাদি: আল কামুসুল মুহিত: ৩৪৪ পৃ.।

[2] ইওয়াজি: ফিরাকু মুয়াসারা: ৩৪৪।

[3] আল ফরকু বাইনাল ফিরাক: ২৩৫ পৃ.

[4] তারিখুত তবারি: ৪/৩৪০

[5] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৭/১৭৩

[6] সুরা মায়েদা: ৫/৫৫ (অনুবাদ) তোমাদের বন্ধু তো কেবল, তার রাসুল এবং সেই মুমিনগন; যারা বিনীত হয়ে সালাত আদায় করে এবং যাকাত প্রদান করে। 

[7] ফাদাক: খায়বারের নিকটবর্তী কিছু জমি, যা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালে ফাই (যুদ্ধহীন হস্তগত সম্পদ) হিসেবে পেয়েছিলেন। আল্লাহর রাসুলের ইন্তেকালের পর ফাতেমা রাদি. আবু বকর রাদি. এর কাছে সে সম্পদের মিরাছ দাবি করেন। আবু বকর রাদি. তখন বলেন: আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনেছি: لا نورث ما تركنا به صدقة  আমরা নবিগণ কাউকে ওয়ারিছ বানাই না। আমরা যা রেখে যাই, তা সদকা। তখন তিনি দাবি করেন যে, আলি রাদি.-কে এই জমির তত্ত্বাবধায়ক বানানো হোক। আবু বকর রাদি. এ প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়ে বলেন: আল্লাহর কসম! এ সম্পদে আমি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যা যা করতে দেখেছি, তাই করব। তখন ফাতেমা রাদি. কিছুটা মনোক্ষুন্ন হন এবং দীর্ঘদিন আবু বকর রাদি. এর সঙ্গে কথা বলেন নি।  ফাতেমা রাদি. এর মৃত্যুর পূর্বে আবু বকর রাদি. তার কাছে যেয়ে বলেন: আল্লাহর কসম, আমি আমার ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ, পরিবারপরিজন, আত্মীয়স্বজন—সবকিছুই আল্লাহ, তার রাসুল ও তার আহলে বাইতের সন্তুষ্টির জন্য পরিত্যাগ করেছি। তখন ফাতেমা রাদি. সন্তুষ্ট হয়ে যান। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ২/১২১, তবকাতে ইবনে সা’দ: ৮/২৭, ফতহুল বারি: ৬/১৩৯।

[8] তোহফায়ে ইসনা আশারিয়া: ২৪-২৬



Leave a comment