১ম পর্ব
লালন শাহের জীবনবৃত্তান্ত দুটো ধাপে ভাগ করা যায়। ১. সন্ন্যাস জীবন গ্রহণের পূর্বকার ইতিহাস। ২. সন্ন্যাস জীবন গ্রহণের পরের ইতিহাস। এরমধ্যে দ্বিতীয় ভাগের অনেকটা তার গান নির্ভর আর কিছুটা শিষ্যদের থেকে গ্রহণকৃত। গান থেকে আমরা তার চিন্তা-চেতনা, মতবাদ ও কর্মের পরিচয় লাভ করি। সঙ্গে সঙ্গে শিষ্যদের থেকে শুনেও তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারি। তবে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণের পূর্ব অধ্যায় সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য ও প্রামাণিক ইতিহাস পাইনা। যতটুকুনই পাই, তার পুরোটার ভিত্তিই জনশ্রুতি। যেহেতু একজন মানুষের পরিচয় লাভের ক্ষেত্রে সূচনাকালীন জীবনবৃত্তান্তের অবগতি মৌলিক ইতিহাসের অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে, তাই শুরুতে আমরা সে পথ মাড়ানোর চেষ্টা করব।
অবশ্য লালনের সূচনাকালীন জীবনবৃত্তান্ত বলা হোক কিংবা সন্ন্যাস গ্রহণের পরবর্তী ইতিহাস; সবগুলোর উৎস অতিপ্রাচীন ও দুর্লভ। এক্ষেত্রে পাক্ষিক হিতকারী পত্রিকা (৩১ অক্টোবর ১৮৯০)—এর নিবন্ধ, সরলা দেবী (১৮৭২-১৯৪৫)—এর প্রবন্ধ (ভারতী; ভাদ্র ১৩০২), মৌলবী আবদুল ওয়ালী (১৮৫৫-১৯২৬)—এর (The Journal of the Anthropological Society of Bombay’-vol-v, No.4, 1900) প্রবন্ধ, বসন্তকুমার পাল (১৮৯০-১৯৭৫)—এর (প্রবাসী; শ্রাবণ ১৩৩২ ও বৈশাখ ১৩৩৫) প্রবন্ধ ও লেখিত গ্রন্থ মহাত্মা লালন ফকির এবং মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের (১৯০৪-১৯৮৭) হারামণি (২য় খণ্ড: ১৯৪২ ও ৪র্থ খণ্ড: ১৯৫৯, ৭ম খণ্ড ১৩৭১) গ্রন্থে লালনজীবনের বেশ কিছু উপাদান পাওয়া যায়। এসব দ্বারা তার জীবনের একটা কাঠামো দাঁড় করানো গেলেও তা যে অসম্পূর্ণ; তা বলাই বাহুল্য। তবুও আমরা গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে স্থির হওয়ার প্রায়স চালাব ইন শা আল্লাহ।
জন্ম
লালন শাহের জন্মবৃত্তান্ত বিশ্লেষণের পূর্বে তার জন্মসাল দেখে নিই। কারো মতে লালন শাহের জন্ম ১৭৭২সালের ১৪ই অক্টোবর। লালন শিষ্য দুদ্দু শাহের নামে প্রচারিত লালনচরিত নামক পুথি গ্রন্থে লেখা হয়:
“এগারো শো ঊন আশি কার্তিকের পহেলা,
হরিষপুর গ্রামে সাঁইর আগমন হৈলা।”
আর ১১৭৯ বঙ্গাব্দের ১লা কার্তিক ১৭৭২সালের ১৭ই অক্টোবর হয়। গবেষক মুহাম্মদ আবূ তালিব ও এস এম লুৎফর রহমান প্রমুখদের গবেষণা ও ইতিহাস তালাশের মূল উৎস কথিত এই পুথিগ্রন্থ ।[1] তাই তিনি উপরোক্ত জন্মসালটি প্রাধান্য দিয়েছেন।[2] লালন গবেষক মতিলাল দাসের মতানুসারে ১৭৭৪সাল।[3] এ মতটিই উপেন্দ্রনাথ ভট্টচার্যসহ অধিকাংশ গবেষক গ্রহণ করেছেন। লোকসাহিত্য গবেষক ‘হারামানিসংগ্রহ’ খ্যাত ড. মনসুর উদ্দীনের মত ১৭৭৫ সাল। অবশ্য তিনি ১৩৬৫ সালের সাহিত্য পত্রিকায় লালন শাহের গান শীর্ষক আলোচনায় ১৭৭২ বলে উল্লেখ করেছেন। আবার তিনিই ১৩৭১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত বাংলা একাডেমির ‘লোকসাহিত্য’ পত্রিকায় ১৭৭৪ বলে উল্লেখ করেছেন। এ হিসেবটা মূলত লালন শাহের ১১৬ বছর বয়সকে আসল ধরে করা হয়েছে। অবশ্য ড. আনোয়ারুল করিম রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে লালনের বয়সের পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে লালনে রবয়স ১২৪ বছর সাব্যস্ত করেছেন আর জন্মসাল বলেছেন১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ।[4]
জন্মসাল বিশ্লেষণ
প্রসিদ্ধ মতে লালন শাহের বয়স ১১৬ বছর ও জন্মসাল ১৭৭৪ সাল। কিন্তু আমার প্রশ্ন, এর সাপক্ষে প্রমাণ কী? বা অধিকাংশ গবেষকদের এ সালের উপর ঐক্যমত হওয়ার ভিত্তি কী? যখন আধুনিক যুগেই মানুষ কারো জন্মসাল ও তারিখ পুরোপুরি মনে রাখে না, সেখানে অষ্টোদশ শতাব্দীর একটা দরিদ্র পরিবারের অখ্যাত ছেলের জন্ম-তারিখ কে মনে রাখবে? আর বয়সটাও কাটায় কাটায় ১১৬ কেনো? ভিন্ন সংখ্যাওতো হতে পারে! অথচ বয়স নির্ধারণকারী সকল গবেষক একথা স্বীকার করেছেন যে, লালনের জন্মসাল নিয়ে নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করার কোনো বাস্তব প্রমাণ—যাকে আমরা ‘পাথুরে প্রমাণ’ বলি—তা কারো কাছেই নেই।[5]
এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, লালনকে সর্ব প্রথম প্রচার মাধ্যমে উল্লেখ করেছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় (১০ ভাগ ১৭ সংখ্যা: ভাদ্র ১ম সপ্তাহ ১২৭৯/ আগস্ট ১৮৭২) জাতি নামক নিবন্ধে। যেখানে লালনের নতুন ধর্ম আবিস্কার ও জাতিতে কায়স্থ হওয়ার দাবি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য ছিলনা। তখন লালন জীবিত। তার জীবদ্দশায় আর কেউ তাকে ছাপার হরফে আনার প্রয়োজন বোধ করেনি। এমনকি তার মৃত্যুর পর ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে কেবল তিনটি প্রবন্ধ ছাড়া আর কোনো মিডিয়াপ্রচার পায় নি। তাকে নিয়ে গবেষণার সূচনা ও লেখালেখির মূল সময়টা ছিল বিংশ শতাব্দী। এরমধ্যে উৎস ও প্রামাণিক হতে পেরেছিল মীর মোশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘পাক্ষিক হিতকারী’ পত্রিকা। লালনের মৃত্যুর ১৪দিন পর ৩১ই অক্টোবর এ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ‘মহাত্মা লালন ফকির’ নামে সুদীর্ঘ একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। সে প্রবন্ধেই সর্বপ্রথম দাবি করা হয় যে, ‘মৃত্যুর সময় লালনের বয়স হয়েছিল ১১৬বছর।’
পত্রিকাটির প্রকাশক ছিলেন শ্রীদেবনাথ বিশ্বাস। মুদ্রিত হতো রজনীকান্ত ঘোষ কতৃক কুমারখালী মথুরানাথ মুদ্রাযন্ত্র থেকে। এ পত্রিকা`য় সম্পাদকের নাম থাকত না। সহসম্পাদক হিসেবে কেবল উকিল রাইচরণ দাসের নাম থাকত। কেননা মীর মোশাররফ হোসেন তখন চাকুরী সূত্রে টাঙ্গাইল বসবাস করত। পরবর্তী বছর থেকে পত্রিকাটি টাঙ্গাইল থেকেই প্রকাশিত হতো।[6]
যাইহোক, লালনকে নিয়ে লেখা ওই প্রবন্ধে যেহেতু কারো নাম ছিল না, তাই আমরা ধরেই নিতে পারি এর লেখক রাইচরণ দাস ছিলেন। আর লালনকে নিয়ে যারা লিখেছেন, তাদের মধ্যে হিতকারী পত্রিকার এই প্রবন্ধকার তার সরাসরি সাক্ষাত লাভ করেছেন। কেননা তিনি লিখেছেন: “ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি; আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি।” এ প্রবন্ধের শেষদিকে লালনের প্রাথমিক জীবনবৃত্তান্ত লেখার আগে তিনি বলেন: “ইহার জীবনী লিখিবার কোনো উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না। শিষ্যেরা হয়ত তাঁহার নিষেধক্রমে না হয় অজ্ঞতাবশত: কিছুই বলিতে পারে না।”[7] এখন প্রশ্ন হলো, যদি লালন নিজে কিছু না বলতেন কিংবা শিষ্যরাও বলতে না পারতেন, তবে তিনি যে ১১৬ বছর বয়সে মানবলীলা সংবরণ করেন, লেখক এ তথ্য কীভাবে উল্লেখ করলেন? এটা কী প্রমাণহীন অসার দাবি নয়? কেননা হিতকারীর এ প্রবন্ধের উপর ভিত্তি করেই সরলা দেবী, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও বসন্ত কুমার পাল ১১৬ বছর বয়স লিখেছেন। আর পরবর্তীরা হয়তো তাদের অনুসরণ করেছেন কিংবা অনুমান করে লিখেছেন।
হিতকারীর ওই প্রবন্ধের পাঁচ বছর পরে ‘ভারতী’ (ভাদ্র ১৩০২ ও আগস্ট, সেপ্টেম্বর ১৮৯৫)—পত্রিকার সম্পাদিকা সরলা দেবী ‘লালন ফকির ও গগন’—নামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। বলা যায়, হিতকারীর ওই প্রবেন্ধর পরে এটা দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ, যাতে লালনপ্রসঙ্গে আলোচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে গবেষক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সরলাদেবীর কাছে লালন সম্পর্কে যা জেনেছিলেন, তা ছিল ওসব ভিত্তিহীন গালগল্প। যা কোনো ঐতিহাসিক যুক্তি বা সুদৃঢ় তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত না।[8]
যাইহোক, এই দীর্ঘ আলোচনার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো লালন শাহের জন্ম সালের ব্যপারে গবেষকদের দাবির অসারতা প্রমাণ করা। আমি মনে করি তার মৃত্যুসাল বাদে অন্যকোনো সাল কিংবা বয়স নির্ধারণ করাই বোকামি। কাজেই তার জন্ম অষ্টোদশ শতাব্দীতে হোক, কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দী—আমাদের ভিত্তিহীন সে দাবির উপর পড়ে না থেকে তার পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করাই শ্রেয়।
(দ্বিতীয় পর্বের লিংক: https://wp.me/pgP0Ho-4J)
[1] এই পুথি নিয়ে বিশ্লেষণ সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।
[2] লালন শাহ ও লালন গীতিকা: ২য়খণ্ড ভূমিকা-ট। মূলত আবূ তালিব সাহেব কেবল সাল উল্লেখ করেছেন। তারিখ আমি হিসেব করে বের করেছি।
[3] লালন গীতিকা: ভূমিকা।
[4] লালন চিন্তা ও কর্ম: ৫২
[5] সনাৎকুমার মিত্র; লালন ফকির কবি ও কাব্য: পৃ. ২০
[6] বসুমতী, ভাদ্র, ১৩৫৮, বাংলা সাময়িকপত্র, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৮, সুত্র: বাংলার বাউল গান: ২/৭
[7] আবুল আহসান চৌধুরী; লালন ফকির: ১৩৬
[8] লালন ফকির: কবি ও কাব্য: ২২


Leave a comment