জন্মগত ধর্ম

(২য় পর্ব….. ১ম পর্বের লিংক: https://wp.me/pgP0Ho-4E )

লালন ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধর্মীয় পরিচয় বহন করেন নি। বরং মানব ধর্ম নামে একটি স্বতন্ত্র মতবাদের জন্ম দিয়েছেন। যে মতবাদটি বিকৃত সুফিবাদ, বৈষ্ণব ও বাউলবাদের সমন্বয়ে গঠিত। যার বিস্তারিত বিবরণ আমরা তার গানেই পেয়ে যাই। কিন্তু মূল মতবিরোধ তার জন্মগত ধর্ম নিয়ে। এ বিষয়টি অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। বহু গবেষক বহু মত ব্যক্ত করলেও প্রত্যেকেই নিজেস্ব ডেরা থেকে চিন্তা করেছেন। যেমন আপন চিন্তার আলোকেই ব্যাখ্যা করেছেন তার গান। সবার মতগুলো বিশ্লেষণ পূর্বক আমরা নিরেপক্ষভাবে সঠিক অনুধাবনের দিকে পৌঁছানোর বেশ চেষ্টা করেছি। যেহেতু লালন শাহ চিরকালই এ বিষয়ে ছিলেন নিশ্চুপ, গানেও রেখে যান নি কোনো উপস্বর্গ; তাই শতভাগ নিশ্চয়তার সঙ্গে কোনো মত নির্ধারণই নিরাপদ নয়। এ পর্বে আমরা জানব তার জন্মগত ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন গবেষকদের মতামত। আগামী পর্বে জানব এ বিষয়ক বিশ্লেষণ ও ভারসম্যপূর্ণ একটি সমাধান।

লালন শাহের জন্মগত ধর্ম সম্পর্কে গবেষকগণ দু’ ভাগে বিভক্ত হয়েছেন। একদল বলেন লালন হিন্দু ঘরের সন্তান ছিলেন আরেক দলের মতে তিনি মুসলিম ঘরের সন্তান। হিন্দুঘরে জন্মগ্রহণের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েছেন লালনের প্রথম জীবনীকার বসন্তকুমার পাল, প্রথম ইংরেজী জীবনীকার মৌলবী আবদুল ওয়ালী, ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ড. আনোয়ারুল করীম মিঞা, ড. মতিলাল দাস, সনাৎকুমার মিত্র ও ড . আবুল আহসান চৌধুরী প্রমুখ। অপরদিকে পূর্ববঙ্গীয় বাউল সমিতির প্রাক্তন সেক্রেটারী শাহ লতিফ আফি আনহু, ড. খন্দকার রিয়াজুল হক,  আবূ  তালিব ও ড. এস এম লুৎফর রহমান প্রমুখের মতে লালন শাহ ছিলেন জন্মগত মুসলমান।

অবশ্য এ দু’ মতের বাইরে কবি জসিম উদ্দীন, মৌলবী মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন,  যতীন্দ্রসেন গুপ্ত ও সুধির চক্রবর্তী প্রমুখরা মনে করেন, লালন হিন্দুঘরে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিলেন। মোবারক হোসেন খান উল্লেখ করেন, অধিকাংশের মতে লালন শাহ সিরাজ শাহের হাতে মুসলমান হন।[1] অবশ্য এ মতটি ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টচার্য বেশ শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি কেবল মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীনের মত উল্লেখপূর্বক লেখেন: “মনসুরউদ্দীন সাহেব কি ফকিরদের গানই কেবল সংগ্রহ করিয়াছেন, গানের ভিতরে প্রবেশ করেন নাই? আশ্চর্যর বিষয়: লালনের গানে যে ধর্মমত ব্যক্ত হইয়াছে, তাহাকে কি করিয়া অধ্যাপক সাহেব ইসিলাম ধর্ম বলিয়াছেন? কোরাণের দুই চারিটি গৎ বা কয়েকটি আরবী বা ফারশী শব্দ দেখিয়াই কি অধ্যাপক সাহেব ঐরূপ অনুমান করিয়াছেন?[2]

যাইহোক, এখন আমরা উভয় মতের বিস্তারিত বিবরণ শুনব।

বিস্তারিত বিবরণ

লালনকে যারা মুসলমান বলেন, তাদের দাবিমতে তার বাবার নাম ছিল কাজী দরীবুল্লাহ[3], অনেকের মতে দরীবুল্লাহ দেওয়ান।[4] মা আমেনা খাতুন ও পিতামোহ গোলাম কাদির। গ্রাম বর্তমান ঝিনাইদাহ জেলার হরিণাকুণ্ড থানার হরিশপুর।[5] বাবামায়ের তিন ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। ভাইদের নাম যথাক্রমে আলম, কলম আর লালন। এরমধ্যে আলম কলকতায় কায়িকশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না তেমন। কলম গ্রামেই কৃষিকাজ করতেন। ছিলেন খুবই গরীব। আর লালন ছিলেন রাখাল। ছোটবেলায় পিতামাতা হারান তারা। ও দিকে সাংসারিক কাজের উদাসীনতার দরুন মেঝ ভাইয়ের বকাঝকা খেয়ে লালন গৃহ ত্যাগ করেন। এরপর কিছুদিন নিজগ্রামেরই ইনু কাজির বাড়িতে রাখালের কাজ করেন। বৈশাখের এক ক্লান্ত দুপুরে লালন পথের ধারে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন পাল্কী বয়ে বাড়ি ফেরার পথে নিঃসন্তান সিরাজ শাহের দৃষ্টিতে পরে যান এবং লালনকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করে হরিশপুর নিয়ে আসেন।[6]

খন্দকার রিয়াজুল হক লালনের জীবনীতে লেখেন যে, পালকপিতা সিরাজশাহ  একদিন লালনের কণ্ঠে মানবদেহসম্বোলিত একটি গান শুনে মুগ্ধ হন। এবং তাকে দেহতত্ত্ব জ্ঞান লাভের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির জন্য গুরুরদীক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সিরাজ শাহের অমত সত্যেও লালন তাকেই দীক্ষা গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন।

এরপর সিরাজ শাহের আধ্যাত্মিক গুরু আমানাত উল্লাহ শাহ লালনকে সৃষ্টি বৈচিত্রের উপর প্রত্যক্ষজ্ঞান আহরণের জন্য ভ্রমণের নির্দেশ দেন। তখন লালন হরিশপুর থেকে নবদ্বীপে আগমন করেন। সেখানে পদ্মবতী নামক এক মহিলার গৃহে অবস্থান করেন। এরপর লালন হিন্দু ও বৌদ্ধ তীর্থ গয়া, কাশী, পুরী ও বৃন্দাবন পরিভ্রমণ করেন এবং আধ্যাত্মবাদদর্শন, সুফিবাদসহ বিভিন্নমতবাদের উপর দীক্ষা লাভ করেন।

দীর্ঘ একযুগের পর্যটন শেষে ১৮১৫ সালে লালন নবদ্বীপে ফিরে আসেন।[7] সেখান থেকে রাজশাহীর প্রেমতলীর নিকটস্থ খেঁতুরি মেলায় যান। এ মেলাটি ছিল বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান। যা প্রতি বছরই বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ নরোত্তম ঠাকুরের অধীনে আয়োজিত হতো। লালন এখানে এসে বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে গড়াই নদী দিয়ে কুষ্টিয়ার ভাঁড়ারা মতান্তরে হরিশপুর যাত্রা করেন। রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঝিরা তাকে মৃত্যু মনে করে কালীগঙ্গার মোহনার কাছে ফেলে যান। এ স্থানের নামই ছিল ছেঁউড়িয়া। তখন মলম শাহ নামক এক ব্যক্তি মুমূর্ষ লালনকে উদ্ধার করে এবং সে ও তার স্ত্রী তাকে সেবাশুশ্রূষার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলে।[8]

লালনকে যারা হিন্দু বলে থাকে, তাদের বর্ণনা নিম্মরূপ:

লালন হিন্দু কায়স্থ ঘরের সন্তান।[9] বাল্যনাম লালনদাস।[10] কেউ বলেন লালন চন্দ্ররায়।[11] বাবার নাম মাধবকর আর মায়ের নাম পদ্মবতী। বর্তমান কুষ্টিয়া ও তৎকালীন নদীয়া জেলার অধীন কুমারখালী এলাকার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গড়াই নদীর তীরবর্তী ভাঁড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতামাতার একমাত্র সন্তান। ছোটবেলায় তার বাবার মৃত্যুর কারণে আর্থিক অসঙ্গতি তাকে পাঠশালার বিদ্যা গ্রহণ করতে দেয় নি। পিতৃহারা হওয়ায় অল্প বয়সেই তার সংসারের হাল ধরতে হয় এবং অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়। আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে তখন বনিবনা না হওয়ায় লালন তার মা ও স্ত্রীকে নিয়ে ভাঁড়াড়া গ্রামের দাসপাড়ায় বসবাস শুরু করেন। কিশোর বয়সে লালন একদা দাসপাড়ার বাউলদাস ও অন্যান্য সঙ্গীসমেত মুর্শিদাবাদ জেলার বহরামপুর তীর্থযাত্রায় গঙ্গাস্নানে[12]যেয়ে বসন্ত রোগে আক্রন্ত হন। রোগের প্রকোপে চেতনা হারালে গ্রামবাসী তাকে মৃত্যু ভেবে মুখাগ্নি করে[13] নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে গ্রামে তার মৃত্যু সংবাদ রটিয়ে দেয়। তখন তার পরিবার তার শ্রাদ্ধও সম্পন্ন করে। ওদিকে লালন ভাসতে ভাসতে কুষ্টিয়ার কালিগঙ্গা নদীর তীরে এলে তাকে মলমশাহ কারিগর ও তার স্ত্রী মতিজান বিবি উদ্ধার করে সেবা-শুশ্রূষার মাধ্যমে সাড়িয়ে তোলে। কিন্তু রোগের প্রকোপে তার এক চোখ অন্ধ হয়ে যায় এবং মুখমণ্ডলে গভীর ক্ষত চিহ্নের সৃষ্টি হয়।

  • সুস্থতার পর লালন নিজ গ্রামে ফিরে গেলে তার মা ও স্ত্রী বিস্ময়াবিভূত ও যুগপৎ আনন্দিত হলেও তাদের গৃহে আশ্রয় দিতে পারে নি। কেননা মুসলমানদের অন্নজল গ্রহণ করায় গ্রামের সমাজপতি ও আত্মীয়-স্বজন কতৃক সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হন। এবং অন্তিম অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করায় সমাজ তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কেননা হিন্দুধর্মমতে কারো শ্রাদ্ধ বা পারলৌকিক কার্যাবলী সম্পন্ন হলে সমাজে তার কোনো স্থান থাকে না। সে হিসেবেও সবাই তার থেকে দুরুত্ব বজায় রাখে। ফলে ব্যথিত লালন অতিক্ষুব্ধ হয়ে গ্রাম ত্যাগ করেন এবং পুনরায় মুসলমানগৃহে বসবাস শুরু করেন। এখান থেকেই লালন সমাজ-সংসার, শাস্ত্র-আচার ও জাতধর্ম সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। এবং তার মনে বৈরাগ্য ভাবের উদয় হয়। সাম্প্রদায়িক জাতধর্ম ও গোত্রকুল সম্পর্কে তার গানে যে তীব্র অনীহা ও অসন্তোষ ফুটে উঠেছে, তার পেছনে যে তার ব্যক্তিগত জীবনের মর্মান্তিক ও দুঃখজনক অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।[14]
  • ড. মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন কলকতা ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক মৌলবী আহম্মদ হোসেনের চিঠির বরাতে উপোরক্ত ঘটনাটি বেশ ভিন্নতা সহকারেই বর্ণনা করেন। আমি ঘটনাটি দ্বিরুক্তি না করে কেবল পৃথক জায়গাটি দেখানোর চেষ্টা করব।  “…..লালন বিবাহের পর মায়ের সঙ্গে নবদ্বীপে গঙ্গাস্নানে যান। সেখানে ভয়ংকর বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের নির্দেশে তার মা অন্তর্জলী দেন। বেহুশ লালন হুশ ফিরে পেয়ে কাতরাতে কাতরাতে পানি প্রার্থনা করেন। তখন এক মুসলিম মহিলা তার কাতরধ্বনী শুনে দয়াপরাবশ হয়ে তাকে পানি পান করান। এরপর তার স্বামীর সহযোগিতায় তাকে ঘরে এনে পরিচর্য্যার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলেন। লালন তাদের সঙ্গেই বাস করতে থাকেন এবং তাদের ধর্মপিতা ও ধর্মমাতা বলে সম্বধোন করতেন। গৃহস্বামী একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। লালন তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন। পরে ইসলাম ধর্মের আচার-পদ্ধতি শিখে পালন করতে থাকেন। ওই গৃহ স্বামীর সংস্রাবের ফলে লালনও সংসার বৈরাগী হয়ে গেলেন। কিছুদিন নবদ্বীপে থেকে ধর্মপিতার অনুমতিক্রমে মায়ের দর্শনের জন্য গ্রামে আসেন। আসারকালে ধর্মপিতা এটাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, লালন! আমি তোমার পিতা। আমার থেকে তোমার দীক্ষা লাভ করা সমীচীন না। তাই উপোযুক্ত গুরু সন্ধান করে তার হাতে দীক্ষা নাও। আর আমি যা শিখিয়েছি, তাও রক্ষা করো। ভাঁড়ারা গ্রামের বাড়ি এসে লালন তার স্ত্রীকে সঙ্গে যাবে কীনা জিজ্ঞেস করেন। তার মা তাকে মুসলমান জানা সত্ত্বেও ঘরে আশ্রয় দিতে চান। কিন্তু লালন কেবল সাক্ষাৎ করে পূণরায় বের হয়ে পড়েন এবং দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি সদগুরুর সন্ধানে রত হন। এবং দীর্ঘ অন্বেষণের পর নদীয়া জেলার হরিনারায়নপুর গ্রামস্থ সিরাজ সাঁই নামক একজন পাল্কী বাহকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তার কাছে এক বছর থেকে লালন ফকিরীমতে দীক্ষা গ্রহণ করেন। দীক্ষাকালীন এক বছর লালন সিরাজ শাহকে পাল্কী বহন করতে না দিয়ে নিজেই বহন করতেন। সিরাজ শাহ থেকে উপোযুক্ত দীক্ষা লাভ করে লালন শাহ ফকির নাম গ্রহণ করে কুষ্টিয়ার নিকটবর্তী ছেঁউড়িয়া গ্রামের ভেতর যে গভীর বন আছে, সে বনের একটি আম্র বৃক্ষের নিচে বসে সাধনা শুরু করেন। তখন তিনি আনমেল নামক একপ্রকার কচু খেয়ে জীবনধারণ করতেন।…..[15]
  • কেউ কেউ বলেন যে, লালন কায়স্থ ছিলেন। তিনি একবার নবদ্বীপে বসবাস করছিলেন। তখন পদ্মাবতী নামক এক কায়স্থ মহিলাকে মা বলে ডাকেন। পদ্মাবতীর ছেলে এর কিছুদিন পূর্বেই মারা যাওয়ায় শোকে কাতর মা লালনের মধ্যে তার মৃত্যু সন্তানের আদল দেখতে পান। এরপর থেকে তারা মা সন্তানরূপেই বসবাস করেন।[16]
  • ড. মিযানুর রহমান তাকে বৈষ্ণব মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীচৈতন্য ও বৈষ্ণব কবি শ্রী চণ্ডিদাসের উত্তরসূরি বলে অবহিত করেছেন।[17] কিন্তু এর সাপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উল্লেখ করেন নি। অধরচন্দ্র মজুমদার তো আরেকধাপ এগিয়ে তাকে শ্রীকৃষ্ণের চাচা বলেও মত ব্যক্ত করেন। তিনি লালন সম্পর্কে বলেছিলেন: ‘লালন গোবিন্দচন্দ্র করের খুড়া’। বসন্তকুমার পাল এ উক্তি উল্লেখপূর্বক লেখেন যে, ‘তবে কিরূপ সম্পর্কের খুড়া তাহা আর জানিতে পারিলাম না।[18] কেননা তখন তার বয়স ৯৫ বছর হয়ে গিয়েছিল এবং জ্ঞানলোপ পেয়েছিল।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যায়, লালনের প্রথম জীবনীকার বসন্তকুমার পাল ভোলাই ফকির, পাঁচু শাহ, ভাঙ্গুরী ফকিরানী ও ফকির ওয়াছিমুদ্দীনসহ ভাড়ারা গ্রামের অনেকের কাছে ‘লালন ফকির হিন্দু কায়স্থ ঘরের সন্তান’—তথ্য শুনে প্রবাসী পত্রিকা (১৩৩২ সালের শ্রাবণ সংখ্যায়) একটা প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।[19] এ প্রবন্ধ প্রকাশের পর  ফরিদপুর সাহিত্য সমিতির তৎকালীন সদস্য সচিব অবনীমোহন চক্রবর্তী ও সদস্য বাবু কিরণচন্দ্র ঘোষ কবি জসিমুদ্দীনকে ছয় টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে লালনের জীবনী ও গান ও সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিল। তখন বসন্তকুমার পাল যেসব ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের কাছে পুনরায় জিজ্ঞেস করলে তারা জনশ্রুতি হিসেবে ব্রাহ্মণ সন্তান বলেছিলেন বলে উল্লেখ করেন। এ তথ্যই ভোলাই শাহের কাছে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছিল ‘কিংবদন্তী ব্যতীত লালন সংক্রান্ত প্রকৃত ঘটনা কেউ জানে না।’[20]

তবে ভোলাই ফকির অনেক জায়গায় লালনকে হিন্দু কায়স্থ সন্তান বলে মত ব্যক্ত করেছেন।

এমন অনেক মতই বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সব উল্লেখ করলে আলাদা গ্রন্থেই রূপ নিবে। তবে অধিকাংশ গবেষকদের অনুমান, লালন হিন্দু ঘরের সন্তান ছিলেন। হোক তা কায়স্থ কিংবা ব্রাহ্মণ। এ সংক্রান্ত আলোচনা আর না বাড়িয়ে পিতৃধর্ম নিয়ে একটি অনুসন্ধানী পর্যালোচনা করে বিষয়টির ইতি টানব।


[1] মোবারক হোসেন খান: লালনসমগ্র; (ভূমিকা) লালন শাহ ও তাঁর গান-৪।

[2] বাংলার বাউল ও বাউল গান: ২/১২

[3] লালনের চিন্তা ও কর্ম: ৫৩-৫৪

[4] মোবারক হোসেন খান: লালনসমগ্র; (ভূমিকা) লালন শাহ ও তাঁরগান-৪, লালন শাহ ও লালনগীতিকা: ২য়খণ্ড ভূমিকা-ট।

কাজি আর দেওয়ান; দুটো ভিন্ন পদবি হওয়ায় গবেষক মুহাম্মদ আবূ তালিব

লেখেন: খুব সম্ভবত লালনের পূর্বপুরুষ কেউ কাজী বা বিচারক ছিলেন। স্নেহস্পদ লুৎফর রহমান একটি প্রাচীন টুকরা কাগজে লালনের পিতারনাম ‘দেয়নেতকাজী’ শব্দটি পেয়েছেন। এই দেয়নেত ‘দেওয়ান’ শব্দের অপভ্রংশ বলে মনে হয়। (লালন শাহ ও তাঁর গান-৪, লালন শাহ ও লালনগীতিকা: ২য়খণ্ড ভূমিকা-ট।)

[5] লালন শাহ ও লালনগীতিকা: ২য়খণ্ড ভূমিকা-ট।

[6] লালন চিন্তা ও কর্ম: ৫৩-৫৪, মোবারক হোসেন খান: লালনসমগ্র; (ভূমিকা) লালন শাহ ও তাঁর গান-৫।

[7] মূলত নবদ্বীপ কেন্দ্রিক এ ঘটনার উৎস দুদ্দু শাহ রচিত লালনচরিত নামক পুথিগ্রন্থ। এ পুথিগ্রন্থের হাকিকত সামনে আলোচিত হবে ইন শা আল্লাহ।

[8] লালন শাহ ও লালনগীতিকা: ২য়খণ্ড ভূমিকা-ড, লালনের চিন্তা ও কর্ম: ৫৪-৫৭

[9] লালনের জীবদ্দশায় তার জন্মগত হিন্দু হওয়ার আলোচনাটা খুব জোড়শোরেই চলে। মৃত্যুর পরেও বাকি থাকে এর ধারাবাহিকতা। এখানে কয়েকটি তথ্য উল্লেখ করছি।

লালনের ঘনিষ্টবন্ধু ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’—পত্রিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ১৮৭২ সালের আগস্ট মাসে লালনকে সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে তুলে এনেছিলেন। (১০ ভাগ ১৭ সংখ্যা: ভাদ্র ১ম সপ্তাহ ১২৭৯/ আগস্ট ১৮৭২) তিনি তার পত্রিকায় জাতি নামক একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন: “লালন শাহ নামে এক কায়স্থ আরেক ধর্ম আবিস্কার করিয়াছে। হিন্দু মুসলমান সকলেই এই সম্প্রদায়ভূক্ত। …… ৩/৪বৎসরের মধ্যে এই সম্প্রদায় অতিশয় প্রবল হইয়াছে। ইহারা যে জাতি ভেদ স্বীকার করে না সে কথা বলা বাহুল্য।”

লালন শাহ ইন্তেকাল করেছিলেন ১৮৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর। এর ১৪ দিন পরে অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর কথাসাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক হিতকারী পত্রিকায় ‘মহাত্মালালনফকির’—নামে একটি সুদীর্ঘ নিবন্ধ ছাপা হয়। যেখানে লালন শাহের জীবন ও কর্মের উপর আলোকপাত করা হয়। সেখানে লেখা হয়, “ইঁহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছুই বলিতেন না। শিষ্যেরা হয়তো তাঁহার নিষেধক্রমে না হয় অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারিতেন না। তবে সাধারণে প্রকাশ লালন ফকির জাতিতে কায়স্থ ছিলেন।”[9]

মীর মোশাররফ হোসেন ও লালনের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। অবশ্য এ নিবন্ধ মীর মোশাররফ হোসেনের লেখা ছিল না বরং এ পত্রিকার সহ সম্পাদক রাইচরণ দাস লিখেছিলেন। কেননা সে সময় মীর মোশাররফ হোসেন চাকুরীসুত্রে টাঙ্গাইল অবস্থান করছিলেন। অবশ্য রাইচরণ দাসেরও লালনের সঙ্গে সদ্ভাব ছিল। ছিল আসা যাওয়া। কেননা এ নিবন্ধেই রয়েছে: ‘ইঁহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি, আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি।’

তাছাড়া সোলায়মান আলী সরকার লালন শাহের মরমী দর্শন বইয়ে লেখেন: ‘বঙ্গের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি এমনকি ব্রাহ্মধর্ম রচয়িতা, সমাজ সংস্কারক, ধর্ম সংস্কারক, রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও জমিদার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত তাঁকে নিমন্ত্রণ করে শিলাইদহে নৌকায় নিয়ে ধর্মালাপে পরিতৃপ্ত হন।’ (পৃ.৬) জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা। তিনি ছিলেন হিন্দুদের সমুচ্চজাত হিসেবে পরিচিত ব্রাহ্মণ। কঠোর ধর্মপরায়ন। যা রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থেকেই সুস্পষ্ট হয়। কেননা রবিন্দ্রনাথের গানই ছিল ঋগ্বেদ। অর্থাৎ ধর্মপরায়নতা তার পারিবারিক ঐতিহ্য। এরকম একজন কঠোর হিন্দু ব্যক্তি লালনের সঙ্গে কোন ধর্মালোচনায় পরিতৃপ্ত হতেন? ইসলাম! সুফিবাদ!! না হিন্দু!? আর ব্রাহ্মণরা জাতপাতে বিশ্বাসী হয়েও একজন অহিন্দুর সঙ্গে ধর্মালোচনায় ব্রত হবেন? নাকি এরচেয়ে বহ্নি বিবিক্ষু হওয়াটাই তাদের জন্য সহজতর হবে?

১৯০০ সালে ‘The Journal of the Anthropological Society of Bombay’-vol-v, No.4, 1900, pa. 217’ এ প্রকাশিত  `On some curious Tenets and Practices of a Certain Class of Faquirs of Bengal’ প্রবন্ধটি প্রথমে ১৮৯৮ সালে ৩০ নভেম্বর বোম্বাইয়ের অ্যানথ্রোপোলজিকাল সোসাইটিতে পঠিত হয় এবং পরবর্তীতে এ প্রবন্ধের অধিকাংশই প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির শেষে Appendix এ লালন শাহের জাত-ধর্ম সম্পর্কে হিতকারীর মতো অনুমান নির্ভর তথ্য পরিচিতি তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধে বলা হয়:

“Another renowned and most melodious versifier whose Dhuas are the rage of the lower classes and sung by boatmen and others was far famed Lalon Shah. He was a disciple of Siraj Shah and both were born in the village Harispur, Sub-division Jhenidah, District Jessore.

Having travelled long and made pilgrimages of jagannath and other shrines and met with all sorts of devotees, he at last settled at Mauza Siuriya, near the sub-divisional headquarters of kustia, Nadia. Here, he lived, feasted, sang and worshiped and was known as a kaestha and where he dried some ten years ago. His disciples are many and his songs are numerous.”[9]

এখানেও লালনকে কায়স্থ বলে উল্লেখ করেছেন। (বাউলদর্শন ও লালনতত্ত্ব: ১৭)

সর্বশেষ লালন শাহের প্রথম জীবনীকার বসন্তকুমার পালের অভিমতটি উল্লেখ করছি। তিনি স্বীয় প্রণীত ‘মহাত্মা লালন ফকির’ গ্রন্থে লালন শাহকে জন্মগত কায়স্থ বলেই উল্লেখ করেছেন। এবিষয়ে এভাবে আলোচনা করলে লেখার কলেবর বৃদ্ধিই পাবে, তাই এখানেই ক্ষান্ত করছি।

[10] মোবারক হোসেন খান: লালনসমগ্র; লালনশাহ ও তাঁর গান-৫।

[11] হারামণি: ২য় খণ্ড ভূমিকা:

[12] হিন্দুদের কাছে গঙ্গা একটি পবিত্র নদী। তাদের বিশ্বাসমতে এ নদী স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। হিমালয়ের যে পাহাড় থেকে এ নদী বয়ে এসেছে,  সেখানে স্বয়ং মহাদেব এঁকে নিজ জটায় ধারণ করেছেন। এ নদীই বাংলাদেশে পদ্মানামে প্রসিদ্ধ।

[13] মহাত্মা লালন ফকির: ১১।

[14] আবুল আহসান চৌধুরী; লালন শাহ: ১২-১৩, বাংলার বাউল ও বাউল গান: ২/৮-১১

[15] হারামণি:

[16] মোবারক হোসেন খান: লালনসমগ্র; (ভূমিকা) লালন শাহ ও তাঁর গান-৬, লালন শাহ ও লালন গীতিকা: ভূমিকা: ঠ-ড।

[17] লালনের চিন্তা ও কর্ম: ৮৬

[18] মহাত্মা লালন ফকির: ২

[19] মুহাম্মদ আবূ তালিব; লালন শাহ ও লালন গীতিকা: ২য় খণ্ড ভূমিকা-ছ।

[20] লালন শাহের মরমি দর্শন: ৩-৪



Leave a comment