আল্লাহ সম্পর্কে এক হিন্দু ভাইয়ের দুটো প্রশ্ন

প্রশ্ন: ইসলাম যদি আল্লাহ তায়ালার একমাত্র মনোনীত ধর্ম হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তায়ালা একজনকে মুসলমানের ঘরে ও আরেকজনকে হিন্দু, ইয়াহুদি কিংবা অন্যকোনো জাতির ঘরে পাঠালেন কেনো? মুসলমানের ঘরে জন্মের কারণে সে জান্নাতে গেলো আর অমুসলিমের ঘরে জন্মের কারণে আরেক ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে? এটা কি আল্লাহর যুলুম নয়?

উত্তর: ইসলাম কোনো জাতিগোষ্ঠির নাম নয় যে, কেউ মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করলেই মুসলমান হিসেবে পরিগণিত হবে। বরং ইসলাম হলো আল্লাহ তায়ালার বিধানের সামনে নিরঙ্কুশ আত্মসমার্পন। কাজেই যে যতটুকু আল্লাহ তায়ালার বিধানের উপর আমল করবে সে ততটুকু মুসলমান। আবার তার মৌলিক বিশ্বাসে যদি এমন কোনো বিষয় চলে আসে, যা কুরআন ও হাদিস পরিপন্থী; তবে সে যতোই আমল করুক না কেনো, মুসলমান হিসেবে হবে না। অনুরূপ ইসলামের বিপরীত কেউ যদি সেকুলার ব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নেয়, সেও ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। আবার কেউ হিন্দু ঘরে জন্মগ্রহণ করলেও আমরা তাকে ততক্ষণ অবধি হিন্দু বলতে পারি না, যতক্ষণ না সে ওই ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসগুলো হৃদয়ে স্থান দেয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “প্রত্যেক বাচ্চাই ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। তার বাবা-মা তাকে ইয়াহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অগ্নী পূজক (মুশরিক) বানায়।”[1]

কাজেই কেউ যদি হিন্দুর ঘরে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালার বিধানের সামনে মাথা নত করে কিংবা প্রথমে মূর্তিপূজারী হলেও পরবর্তীতে স্বীয় ভুল বুঝে আল্লাহ তায়ালার দিকে ফিরে আসে, সে কোটি কোটি ওসব কথিত মুসলমান থেকে উত্তম—যাদের চৌদ্দ পুরুষ মুসলমান—অথচ তার ভেতর আল্লাহর কোনো বিধান মানার প্রবণতা নেই। তাই বাস্তবতা হলো জন্মগ্রহণকারী ঘর যেটাই হোক না কেনো, সে কতটুকু আল্লাহ তায়ালার দিকে অগ্রসর হলো এবং তাওহীদ বা একত্ববাদকে নিজের মধ্যে ধারণ করল—তাই ধর্তব্য।

তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিভিন্ন ঘরে প্রেরণের মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষা করতে চান। আমরা যদি সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই, তবে একজন উচ্চ স্তরের মুসলমানও সে মর্যাদায় উত্তীর্ণ হবে না, যে স্তর ও প্রতিদান তাকে প্রদান করা হবে। সাহাবায়ে কিরামের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। যারা নিজেদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজ; সবার বিরুদ্ধে গিয়ে মূর্তিপূজা থেকে এক আল্লাহ তায়ালার দিকে ফিরে এসেছিলেন। এ সম্পর্কেই আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছে করলে তোমাদের একই জাতি বানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের মধ্যে ভিন্নতা এ জন্যই দিয়েছেন যেন তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন। সুতরাং তোমরা নেক কাজে প্রতিযোগিতা করো। আল্লাহ তায়ালার কাছেই তোমাদের সবাইকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।”[2]

প্রশ্ন: আল্লাহ তায়ালাই যদি সৃষ্টিকর্তা ও আমাদের প্রতিপালক হন, তবে এটা তার কেমন ইনসাফ যে তিনি একজনকে ধনী বানালেন আরেকজনকে গরীব? কাউকে বানালেন সুস্থ আবার কাউকে প্রতিবন্ধী? কেনো এই বৈষম্য? এটা কি অন্যায় নয়? 

উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে — জীবন কেবল ভোগের নয়, বরং এক পরীক্ষা।
প্রত্যেক মানুষ এখানে আলাদা প্রশ্নপত্র নিয়ে আসে: কারও পরীক্ষা সম্পদ ও ক্ষমতার, কারও পরীক্ষা অভাব ও ধৈর্যের। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ঘাটতির মাধ্যমে। আর সুসংবাদ ধৈর্যধারণকারীদের জন্য।[3]

অর্থাৎ: ধনসম্পদও পরীক্ষা, দারিদ্রও পরীক্ষা। সুতরাং যে ধনী; দেখা হবে সে কৃতজ্ঞ হয়ে দান করে নাকি অহংকারে মত্ত হয়। আর যে গরিব, দেখা হবে সে ধৈর্য ধারণ করে সত্যপথে অটল থাকে, নাকি হতাশ হয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আমি মানুষকে পরস্পর পরস্পরের উপর মর্যাদা দিয়েছি তাদের পরীক্ষা করার জন্য।[4]

অর্থাৎ, বৈষম্য কোনো অন্যায় নয়—এ এক সুবিন্যস্ত পরীক্ষা ব্যবস্থা। ধনীরা পরীক্ষিত হয় তাদের সম্পদে, আর গরিবরা পরীক্ষিত হয় তাদের ধৈর্যে।

একজন দরিদ্র ব্যক্তির পৃথিবীতে গরিব থাকার অর্থ এই নয় যে, সে আখরাতেও এমন থাকবে। বরং সেখানে সে ধনী ব্যক্তির তুলনায় অধিক প্রাধান্য পাবে। ফলে ধনী ব্যক্তিও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার ধন-সম্পদের জন্য আফসোস করবে।  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রসঙ্গে বলেন: “গরিব মুমিনরা ধনী মুমিনদের চেয়ে ৫০০ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[5]” কাজেই যে দুনিয়ায় বঞ্চিত ছিল, সে আখিরাতে তাড়াতাড়ি পুরস্কার পাবে।
যে যত বড় কষ্টে থেকে আল্লাহর প্রতি ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা ধরে রাখে, সে তত বড় মর্যাদার অধিকারী হবে।

সুতরাং, দুনিয়ার বৈষম্য অন্যায় নয়, এটি ন্যায়বিচারেরই ভূমিকা। এই পার্থক্যের মধ্য দিয়েই যাচাই হয়, কে অহংকারী আর কে কৃতজ্ঞ, কে ধৈর্যশীল আর কে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহে পড়ে আখেরাত বিনষ্ট করছে।

শেষ পর্যন্ত, কারো কষ্ট, কারো প্রাচুর্য সবই এক মহান পরিকল্পনার অংশ। আমাদের সীমিত চোখে হয়তো তা অন্যায় মনে হয়, কিন্তু ন্যায়বিচারের পূর্ণতা প্রকাশ পাবে যেদিন প্রতিটি ধৈর্যের অশ্রু পুরস্কারে পরিণত হবে।


[1] সহিহুল বুখারি: হা. নং: ১৩৫৯, ১৩৮৫, ৪৭৭৫, সহিহ মুসলিম: হা.নং: ২৬৫৮, মুয়াত্তা ইমাম মালেক: হা. নং: ৬৪৬, সুনানু আবি দাউদ: হা.নং ৪৭১৪, সুনানু তিরমিযি: ২১৩৮ মুসনাদু আহমাদ: হা.নং:৭১৮১, ৭৭১২, ৯১০২, ৯৩১৭।

[2] সুরা মায়িদা: ৫:৪৮

[3] সুরা বাকারা: ২:১৫৫

[4] সুরা যুখরুফ: ৪৩:৩২

[5] সুনানু তিরমিযি: হা.নং: ২৩৫১, সুনানু আবি দাউদ: হা. নং: ৩৬৬৬, সুনানু ইবনি মাজা: ৪১২৩, মুসনাদু আহমদ: ১১৯১৫



Leave a comment