লালন শাহের ধর্ম; একটি অনুসন্ধানী পর্যালোচনা

৩য় পর্ব

(২য় পর্বের লিংক: https://wp.me/pgP0Ho-4J)

লালনের পিতামাতার নাম ও জন্মস্থান যেমন তর্ককন্টকিত বিষয়। তেমনই তার পিতৃধর্মও শ্রুতিনির্ভর। কেননা তিনি তার জাত, ধর্ম, সামাজিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সর্বদাই নির্লিপ্ত থাকতেন। আর এ নির্লিপ্ততার ফাঁক গলিয়েই জন্মেছিল জনশ্রুতি। এসব শ্রুতনির্ভর কথাগুলো তার কানে এলেও ছিলেন নিরুত্তর। হয়তো তিনি গানের ভেতরই কোনো তথ্য উপাত্ত রেখে গেছেন, তবে তা থেকে তার জাতপাত নির্ণয় করা অসম্ভব। তবে কিছু কিছু সুত্রধরে আমরা একটা প্রচ্ছন্ন ধারণা পেতেও পারি। তাই একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এ বিষয়ে অভিনিবেশ করব।

তার পিতৃধর্ম নির্ণয়ে সর্বপ্রথম ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টচার্যর উক্তি উল্লেখ করা যায়। তিনি বাউল মতবাদের সঙ্গে হিন্দু সমাজের জাতিগত বৈষম্যের ধারণা ও ভেদ-বুদ্ধিগত বিষয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দ্বন্দের একটা ধারণা প্রদানের জন্য লালনের নিম্মোক্ত গান উল্লেখ করেন:

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।

লালন বলে জাতের কী রূপ, দেখলাম না এ নজরে।

ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান,

নারী লোকের কি হয় বিধান?

বামন চিনি পৈতার প্রমাণ,

বামনী চিনি কি ধরে?

যাওয়া কিংবা আসার বেলায়

জাতের চিহ্ন রয় কার রে।

গর্তে গেলে কূপ-জল কয়,

গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল হয়,

মূলে একজল, সে যে ভিন্ন নয়,

ভিন্ন জানায় পাত্র অনুসারে।[1]

এরপর লেখেন: “ইহাই বাউল সম্প্রদায়ের জাতিভেদ সম্বন্ধে ধারণা। অবশ্য ইহার মধ্যে লালনের একটি ব্যক্তিগত ব্যপার জড়িত আছে। লালন পূর্বে হিন্দু ছিলেন, পরে আচার-ব্যবহারের দিক দিয়া ও সামাজিকভাবে মুসলমান পরিণত হইয়া ছিলেন। হয়তো এই বিষয়ে লোকে তাঁহার জাতির প্রশ্ন তুলিত, হয়তো বা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও করিত। তাহার উত্তরেই সম্ভবত এই গানটি রচিত হইয়া ছিল। লালন যে হিন্দুর ঘরে জন্মিয়া ছিলেন, এই মতবাদটি এই গানের দ্বারা অনেক সমর্থিত হয়।[2]

লালন শাহের শিষ্য ও ধর্ম ছেলে ভোলাই শাহের উক্তিও উল্লেখ করা যায়। তিনি লোকসঙ্গিত বিশেষজ্ঞ ড. মৌলবি মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন: “লালন সাহ জনৈক হিন্দু ভদ্রলোকের ঔরশে জন্মগ্রহণ করেন। তাহার বাড়ী নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত চাপারা গ্রামে। তিনি হিন্দুদিগের তীর্থস্থান গয়া যাওয়ার পথে উৎকট বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন।….[3]

লালনকে যারা মুসলমানের সন্তান দাবি করেছিল, তাদের প্রামাণ্য উৎস ছিল লালন শাহের প্রধান শিষ্য দুদ্দু শাহের লিখিত লালনচরিত নামক পুথিগ্রন্থ। এ গ্রন্থেই সর্বপ্রথম লালন শাহকে মুসলমানের সন্তান ও হরিশপুরের অধিবাসী বলে পরিচয় দিয়েছিল। যদিও এ গ্রন্থ সম্পর্কে গবেষকদের মতামত সামনে আসবে তবুও তার মুসলমান গৃহে জন্মের অভিমতটি যাচাইয়ের জন্য আগেই বিষয়টির অবতারণার প্রয়োজন হচ্ছে। গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী কথিত এ প্রামাণ্য গ্রন্থের শুদ্ধতা জানতে চেয়ে অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফের কাছে একটা পত্র প্রেরণ করলে তিনি ছয়টি পয়েন্ট উল্লেখ করে তা বাতিল সাব্যস্ত করেছিলেন। আমি সেখান থেকে প্রসঙ্গিক একটি পয়েন্ট উল্লেখ করছি:

“পাঁচু (পাঞ্জু), দুদ্দু, লালন—এগুলো কিমুসলমান নাম? সুফী-দরবেশ মুসলিম নাম? যাঁর পিতামহের নাম গোলাম কাদের এবং পিতার নাম দরীবুল্লাহ (দবির কোন ভাষার শব্দ—এর অভিধা কি?—দবীরুল্লাহ কি?) দেওয়ান, মায়ের নাম আমিনা; তার নাম লালন হয় কি করে? তা ছাড়া যিনি নায়েব, প্রতিনিধি, সর্দার কিংবা ধনাঢ্য মানী ব্যক্তিরূপে ‘দেওয়ান’ পদবী যোগে স্থানীয়ভাবে সমকালে পরিচিত, তাঁর বাড়ির নাম ও গ্রাম আজো স্থানীয়ভাবে পরিচিত বা চিহ্নিত থাকার কথা। ‘দেওয়ান-বাড়ির অন্য লোকেরা কি সব মৃত? হরিশপুরে ঊনিশ শতকী ‘দেওয়ান’ বাড়ির বা বংশের হদিস মেলে কি?”[4]

এখানে আলোচিত প্রথম বিষয়টি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। লালন কী কখনো মুসলমানের নাম হতে পারে? ধরে নিলাম অজ্ঞ বাবা-মা রেখেছে। কিন্তু বাবা দরীবুল্লাহ আর মা আমিনা, দাদা গোলাম কাদির—এমন পরিবারের সন্তানের নাম লালন! যদিও দাবিকৃত গ্রন্থটিই প্রত্যাখ্যাত, তবুও অবিশ্বাসীদের জন্য চিন্তাযোগ্য।


[1] লালনকে যারা মুসলমান বলেছে, তাদের মধ্যে মুহাম্মদ আবূ তালিব ও এস এম লুৎফর রহমান তার মুসলমানিত্ব প্রমাণ করার বেশি প্রায়স চালিয়েছেন। এক্ষেত্রে তারা অনেকগুলো পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন। আমার কাছে সবগুলো পয়েন্টের ভিত্তি অসার মনে হয়েছে। সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে তাদের গ্রন্থের খণ্ডনই হয়ে যাবে। যেটা আদৌ আমার ইচ্ছে নয়। তবুও দুটো বিষয়ের খণ্ডন করছি। ১.  তারা দুদ্দু শাহের রচিত পুথিগ্রন্থকে মূল প্রমাণ হিসেবে হাজির করতে চেয়েছেন। অথচ সে পুথি গ্রন্থের কোনো ভিত্তি নেই। এ সম্পর্কিত আলোচনা সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ। দ্বিতীয়ত উপেন্দ্রনাথ ভট্টচার্যর উপস্থাপনকৃত প্রসিদ্ধ এই গান। মজার ব্যপার হলো এ গানটিতে আবূ তালিব সাহেব নিজের থেকে শব্দ যোগ করেছেন। গানটির মূলরূপও প্রাসঙ্গিক বিষয় সনাৎকুমারমিত্র—এর ‘লালন ফকির কবি ও কাব্য’ গ্রন্থ থেকে তুলে ধরছি:

১. সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে,

লালন ভাবে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।

কেউ মালা কেউ তজবী গলায়

তাইতেতো জাত ভিন্ন বলায়,

যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়

জাতের চিহ্ন রয় কাররে।

২. যদি সুন্নত দিলে হয় মোসলমান

নারীর তবে কি হয় বিধান।

বামন চিনি—পৈতা প্রমাণ,

বামনী চিনি কিসেরে।

৩. জগৎ বেড়ে জেতের কথা,

লোকে গৌরব করে যথাতথা,

লালন যে জেতের কাথা (ফাতা)

ঘুচিয়েছে সাধ্-বাজারে।

সরলা দেবির ভারতী পত্রিকায় ১৩০২ সালে লালনের এগারটি গান প্রকাশিত হয়েছিল। এরমধ্যে এ গানটি নয় নাম্বারে উল্লেখ হয়েছে। তবে সেখানে দ্বিতীয় স্তবক ছিল না। অবাক করার বিষয়, একই প্রবন্ধে অক্ষয়কুমার মৈত্র পূর্ণগান উল্লেখ করেছেন। এস এম লুৎফর রহমান দু’ একটি বানান ছাড়া গানটি এভাবেই উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি প্রথম স্তবককে দ্বিতীয় ও দ্বিতীয় স্তবককে প্রথম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আবূ তালিব সাহেব সুন্নাত শব্দটি কেটে খতনা শব্দ বসিয়ে দিয়েছেন। (দেখুন লালন শাহ ও লালন গীতিকা: ২য়খণ্ড, ২৯২নং গান।)

খতনা শব্দটি মুসলমানরা ব্যবহার করে থাকে। তবে কী আবূ তালিব সাহেব লালনকে মুসলমান প্রমাণ করার জন্য ইচ্ছেকৃত এ পরিবর্তন করেছেন? এরপর আবূ তালিব ও লুৎফর রহমান একটা গান উদ্ধৃত করেন। সেখানেও খতনার জাত শব্দের ব্যবহার দেখিয়েছেন। গানটি হলো:

সবে বলে, লালন ফকীর হিন্দু কি যবন।

লালন  বলে, আমার আমি না জানি সন্ধান।

একই ঘাটে আসা-যাওয়া,

একই পাটনী দিচ্ছে খেওয়া,

কেউ খায় না কার ছোঁওয়া

বিভিন্ন জপ কে কোথায় পান।

বেদ-পূরাণে করেছে জারী

যবনের সাঁই, হিন্দুর হরি,

লালন বলে, তাও বুঝতে নারি

দুইরূপ সৃষ্টি করলেন কিরূপ প্রমাণ।

বিবিদের নাই মুসলমানী,

পৈতা নাই যার সেও বাওনী

বোঝোরে ভাই দিব্যজ্ঞানী,

লালন তেমনি খতনার জাত একখান।

(লালন শাহ ও লালন গীতিকা: গান নং: ২৯৩)

আবূ তালিবের এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। এর দুই বছর পরে এস এম লুৎফর রহমানের বই প্রকাশিত হয়। কিছু পরিবর্তনসহ সেখানে গানটি আবূ তালিবের মতই রাখা হয়। গানটির রূপ:

সবাই শুধায় লালন ফকীর

হিন্দু কি যবন।

কারে বা বলব আমি

না জানি সন্ধান।

বেদ পুরাণে করেছে জারি

যবনের সাঁই হিন্দুর হরি

তাওতো আমি বুঝতে নারি

দুইরূপ সৃষ্টি করলেন

তার কি প্রমাণ।

একই পথে আসা যাওয়া

একই পাটনী দিচ্ছে খেওয়া

কেউ খায় না কারো ছোঁওয়া

ভিন্ন জল কে কোথায় পান।

বিবিদের নাই মুসলমানী,

পৈতে যার নাই সেওতো বামনী

[বোঝারে ভাই দিব্যজ্ঞানী]

লালন তেমনি

খাতনার জাত একখান।

অধ্যাপক মানসুরউদ্দীন হারামণি গ্রন্থে ১-৭ খণ্ডে লালনের প্রায় পাঁচশ গান প্রকাশ করেন। মতিলাল দাস রবিন্দ্রনাথের সংগৃহীত খাতার সঙ্গে নিজের জোগাড় করা গান মিলিয়ে চারশ বাষাট্টিটি গান নিয়ে ‘লালনগীতিকা’ সংকলন করেন। ড.  উপেন্দ্রনাথ ভট্টচার্য একশ ষাটটি লালন গান প্রকাশ করেন। আনোয়ারুল করিম ও তার বাউল সাহিত্য ও বাউল গানগ্রন্থে পঞ্চান্নটি লালন গান সংকলন করেন। কিন্তু কেউ আবূ তালিব ও লুৎফর রহমানের মত খতনার জাত শব্দটি উল্লেখ করেননি। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ গানের হঠাৎ এভাবে আত্মপ্রকাশ সন্দেহজনক।

দ্বিতীয়ত এই গানের ভাব ও বক্তব্য লালনের জন্মগত জাতি নির্ণয়ের প্রশ্নের উত্তরে যেসব স্থানে সংগৃহীত হয়েছে, একমাত্র শেষ স্তবকটি ছাড়া সব অভিন্ন। তাছাড়া পূর্বের স্তবকগুলোর সঙ্গে সুর ও লয়ের দিক থেকে এ স্তবকটি বেমানান। লুৎফর রহমান সাহেব লালনের জাতি ও বংশ পরিচয় নির্ণয়ে আরো চারটি গান উল্লেখ করেছেন। এরমধ্যে প্রথমে এই গানটি স্থান পেয়েছে। এটা সুপরিচিত হলেও বাকি তিনটি গান লালনের সংগৃহীত গানের কোথাও পাওয়া যায় না। এমনকি আবূ তালিবও উল্লেখ করেন নি। বসান্তকুমার পাল তার মহাত্মা লালন ফকির নামক গ্রন্থের ১৯ পৃষ্ঠায় উক্ত গানটি উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে আবূ তালিব ও লুৎফর সাহেবদের মত পূর্ণাঙ্গ উল্লেখ না করে কিয়দংশ উল্লেখ করেছেন।

বসন্তকুমার পালের কলমে:

সবে বলে লালন ফকির, হিন্দু কি যবান,

লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান।

এক ঘাটেতে আসা যাওয়া

একই পাটনী দিচ্ছে খেওয়া

তবে কেউ খায়না কারও ছোঁয়া

ভিন্ন জল কোথাতে পান,

বিবিদের নাই মুসলমানী

পৈতা যার নাই সেওতো বামনী

দেখরে ভাই দিব্যজ্ঞানী

দুইরূপ সৃষ্টি করলেন কিরূপ প্রমাণ।

এরপর বসন্তকুমার পাল লেখেন, ‘অবশিষ্ট অংশ সংগ্রহ করিতে পারি নাই।’ বসন্তকুমার পাল আগের হওয়া সত্ত্বেও তিনি যা সংগ্রহ করতে পারেন নি, তারা পরবর্তীতে কীভাবে তা সংগ্রহ করেন? এছাড়া গানের অর্থের মধ্যেও বেশ অসঙ্গতি রয়েছে। কেননা লালনতো সতস্ফূর্ত গান বলতেন। কিন্তু আবূ তালিব ও লুৎফর রহমান সাহেবদের উল্লেখিত শেষ স্তবক আগের গানের মতো সতস্ফূর্ত বলা যায় না। তাছাড়া গানটিতে সমাজ আচার ও ব্যবহারিক দিক থেকে হিন্দু ও মুসলমান পুরুষের মধ্যকার ধর্ম ও চিহ্নগত পার্থক্য করা গেলেও উভয় শ্রেণির নারীদের মধ্যে কোনো ভিন্নতাসূচক চিহ্ন নির্মাণ করা যায়নি। পুরুষে পুরুষে ভেদ চিহ্ন এলেও নারীতে সে ভেদ চিহ্ন কি? এখানে একটি পংক্তি রয়েছে, ‘বেদ পুরাণে করেছে জারি, যবনের সাঁই হিন্দুর হরি’—এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো: বেদ পুরাণ হিন্দুর হরির কথা জারি করতে পারলেও যবনের সাঁইয়ের কথা কেনো জারি করবে? তাছাড়া সমস্ত বাউল ও সমস্ত লালন ভাবনায় যবনের সাঁই ও হিন্দুর হরি পৃথক দুটো রূপ নয়, এক। এ পার্থক্য ও তাৎপর্য যদি লালন বুঝতে না পারেন, তবে দুই জাতি সৃষ্টি হওয়ার প্রামাণিকতা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসে কেন? (লালন ফকির: কবি ও কাব্য: ৬০-৬৫)

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, লালনকে যারা মুসলমান বলেছেন, তাদের মধ্যে তার মুসলমানিত্ব প্রমাণের জন্য সবচেয়ে বেশি কসরত করেছেন মুহাম্মদ আবূ তালিব ও লুৎফর রহমান। কিন্তু এটা যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত, সেটা বুঝাতে এত কথা বলতে হলো। তাকে মুসলমান বানানোটা যে জোড়পূর্বক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

[2] বাংলার বাউল ও বাউল গান: ১২১

[3] হারামণি: পৃ. ১৭৬ (পরিশিষ্ট-গ) প্র. ১৯৪২

[4] লালন শাহ: ১৮-১৯



Leave a comment