বাউলদের বিশ্বাস ও তার উৎস

বাউল মতবাদ মূলত একটি স্বতন্ত্র ধর্মমত। যা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ধর্মের সংমিশ্রণে। বাউল গান পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় যে, এরমধ্যে বৌদ্ধ, হিন্দু, নাথ, শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব ও বিকৃত সুফিবাদের মতো সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্র-ভিত্তিক সমস্ত মতবাদই স্থান পেয়েছে। স্থান পেয়েছে চার্বাক মতবাদীয় বিশ্বাসও। তবে বৈষ্ণব ও সুফিবাদের প্রভাব ব্যাপক। যার সিংহভাগ তন্ত্র ও যোগ সর্বস্ব্য। অবশ্য বাউলদের মধ্যে সুফিপ্রভাব বেশি। কেননা বাউলরা ভাববাদী। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে বাউল গানে ভাব, চিন্তা, সাধনা ও মর্মের বাণীতে পরিপূর্ণ। যা সুফিবাদের ব্রতকথা। তাই দেখা যায় যে, বাউল গান ও সুফিদের মারেফতি ও মুর্শিদি গানের মধ্যে পার্থক্য যৎসামান্য। বিভিন্নস্থানে বাউল গানকে মুর্শিদি ও মারেফতি গানও বলা হয়। সুফি ও বাউল গবেষক ড. মুহম্মদ এনামুল হক বাউল গান চেনার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে লেখেন: …লোকে সচরাচর যাহাকে ভাবের, তত্ত্বের, মারেফতের গান বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকে, তাহাই বাউল-গান। এ গানগুলির মূল প্রেরণা ও উৎস এক। বাউল গানগুলি বঙ্গের নানা অঞ্চলে নানা নামেই পরিচিত হইয়া থাকে। উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের কতকগুলি বিশিষ্ট স্থান ব্যতীত, বঙ্গের আর কোথাও “বাউল” নামটি পর্য্যন্ত সাধারণ লোকের নিকট বিশেষ পরিচিত নহে। পূর্ব্ববঙ্গে বাউল সম্প্রদায় “ফকীর” নামে পরিচিত এবং তাহাদের গানগুলি “মারফতী” বা “মুর্শিদা” গান নামে অভিহিত হয়। উত্তরবঙ্গে “বাউল” গানগুলি সাধারণতঃ “দেহতত্ত্বের গান” নামে পরিচিত এবং পশ্চিমবঙ্গে এই গানগুলি “বাউল” গান বলিয়া কথিত হয়। সাধারণভাবে বাঙ্গলার এই গানগুলিকে “ভাবের গান” (mystic songs) বলা হয়। ….. ইহাদের অন্তর্নিহিত সুর এক হইলেও, পূর্ব্ববঙ্গে অতিরিক্ত মুসলিম প্রভাবের ফলে, বিশেষতঃ পূর্ব্ববঙ্গ ঝড়-ঝঞ্ঝা ও নদীমাতৃকতার পারিপার্শ্বিকতায় পড়িয়া “বাউল” গানগুলি এই অঞ্চলে “মারফতী” বা “মুর্শিদা” গান নামে পরিচিত হইয়া যায়।[1]

অর্থাৎ বাউলদের মধ্যে সুফি প্রভাব অত্যাধিক। বৈষ্ণব প্রভাবও কম না। অনেক বাউলতো এ মতবাদকে আভিজাত্য দানের প্রয়াসে শ্রী-চৈতন্যকেই আদিপ্রতিষ্ঠা বলে ব্যক্ত করে থাকে। অবশ্য এর পেছনে তাদের সাধনভজনার অন্যতম উৎস রাধাকৃষ্ণ নামের সাদৃশ্যতাই মূল। আর চৈতন্যই রাধাকৃষ্ণের যুগলাবতার।[2] কিন্তু বিশুদ্ধ তথ্যমতে চৈতন্যকালে বাউলবাদের ধারণা উদ্ভবই হয় নি।  তাই এ মতকে শক্তিশালী করার জন্য তারা আউলচাঁদকে চৈতন্যের অবতার মনে করে। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্য স্বয়ং মুসলমান আউল চাঁদের রূপে পুনরাবির্ভূত হয়ে এই মতবাদ সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করেন। অবশ্য এ মতবাদের গুরু কর্তাভজা সম্প্রদায়[3]। কেননা আউলচাঁদের পুত্র রাম শরণের ছেলে দুলাল চাঁদ কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হওয়ায় আউলচাঁদকে তারা এ মতবাদের আদিগুরু হিসেবে স্মরণ করে। তবে ইতিহাস এ কথা সাক্ষ্য দেয় যে, আউলচাঁদ বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

বাউলদের মূল সাধনা শরীর কেন্দ্রিক। দেহভজনাই তাদের জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য। আর দেহ কেন্দ্রিক সাধনা চার্বাক দর্শনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এরা মূলত নাস্তিক। বৃহস্পতির মতানুসারী হওয়ায় তাদের বার্হস্পত্য ও লোকায়ত বলা হতো। এরা ছিল বস্তুবাদী। এ ধারার চিন্তার প্রসূন হচ্ছে ইন্দ্রিয়াত্ববাদ, প্রাণাত্বাবাদ ও মনশ্চৈতন্যবাদ। তাদের বিশ্বাসমতে দেহের বিনাশে চৈতন্য লুপ্ত হয় এবং দেহের উপাদানগুলি নিজ নিজ ভূতে মিশে যায়। তাই কর্মফল, স্বর্গ নরক কিংবা আত্মার জন্মান্তর গ্রহণ ইত্যাদি অর্থহীন বিষয়।[4] এটাই বাউলদের বিশ্বাস ও কর্ম। মূলত দেহত্মবাদ সাংখ্য, যোগ ও তন্ত্রের সমষ্টি। বিষ্ণুপুরাণ, ছান্দোগ্য ও মৈত্রেয়ী উপনিষদের ভাষ্যমতে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের ফলে যোগ ও তন্ত্রে একসময় ‘ঈশ্বর’ স্বীকৃত হলেও এসব সাধনায় ঈশ্বরোপোসনার স্থান অপ্রধান। দেহতত্ত্ব্ই মূখ্য।[5] তন্ত্রতত্ত্বেরই মূল কথা যা আছে ভাণ্ডে, তা আছে ব্রাহ্মণ্ডে। আর এটাই বাউলদের কথা।

বাস্তবতাও বাউলবাদের সাধনা স্রষ্টা কেন্দ্রিক নয়, কেবল দেহকেন্দ্রিক। ব্রাহ্মণ্য প্রভাবে যদিও স্রষ্টার নাম নেওয়া হয়, কিন্তু সে স্রষ্টা আল্লাহ নয় বরং গুরু। যেহেতু বাউলদের মূখ্য সাধনা দেহকেন্দ্রিক। আর এ দেহের সর্বাদিক সুখের বিষয় রমণ বা মৈথুন ক্রিয়া; তাই এ সাধনার সর্বাদিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী ভজনা বা সাধনসঙ্গীনির সঙ্গে মৈথুন ক্রিয়া বা রমণ তথা রতিক্রিয়া। আচারভেদ তন্ত্রে রয়েছে যে, তান্ত্রিক সাধনায় নারীর গুরুত্ব অত্যাধিক। শাক্ত ও সহজিয়া সাধনতত্ত্বও এরূপ। বৈষ্ণবদের গোপীভাবও একই বিষয়। খোদ সাংখ্যতত্ত্বের উদ্ভব এই মৈথুন তত্ত্ব থেকে।

বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করার প্রয়োজন। বাউল মতবাদে নারী ভজনা প্রধান অনুসঙ্গের অন্তর্ভূক্ত। বাউলরা দু ধরণের হয়ে থাকে। ১. সংসার বিরাগী, ২. সংসারী। সবারই থাকে সাধনসঙ্গিনী। এটা সাধনার অবশ্যকীয় অনুসঙ্গ। এখানে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সাধনসঙ্গিনী স্ত্রী নয়। স্ত্রী ভিন্ন কেউ হতে পারে। এটা মূলত হিন্দুদের শৈব ও শাক্ত ধর্মের মূল উপাদান। তাদের কাছে নারীই জগৎকারণ আদ্যশক্তি। আর এটাই হলো কালী, তারা, শিবানী। নারী শক্তিতেই পুরুষ হয় শক্তিমান। শিব হচ্ছে সে শক্তিমান। আর শিব শক্তিই অদ্বয় বা ঈশ্বর। তান্ত্রিক সাধনার লক্ষ্য শিব শক্তিকে উপলব্ধি করা। এ শক্তি অর্জনেই নারী ভজনা অন্যতম উপস্বর্গ। বিশেষত নারী যোনি প্রতিমা পূজার উপাদান। আসন, ন্যাস, মুদ্রা, মূলমন্ত্র, বীজমন্ত্র, বর্ণরেখাত্মক যন্ত্র, যোগক্রিয়া, দীক্ষাগ্রহণ প্রভৃতি এ সাধনার অংশ। এরাই গুরুবাদী। এদের সাধনাও গুহ্য। এর তুলনা চলে একমাত্র বৌদ্ধে ধর্মের বোধচিত্ত বা মহাসুখের সঙ্গে। তবে বাউল ধর্মে বীর্য ধারণই মূল সাধনা যা বৌদ্ধ সাধনার বোধচিত্তে প্রয়োজন হয় না। অবশ্য নারী ভোজনার কুৎসিত এ রূপের আনুষ্ঠানিকতা বৌদ্ধ সহজিয়া মতই বলা যায়। তাদের সাধনায়ই সাধনসঙ্গিনী অনুসঙ্গ।

সাধনসঙ্গিনীর প্রয়োজনীতা এতটাই যে, খোদ শ্রী চৈতন্যের গূহ্য পরকীয়া মৈথুনাত্বক সাধন প্রণালী ছিল। তার শিষ্য রূপ, সনাতন, নিত্যানন্দ, জীব প্রমুখ সাধকদেরও পরকীয়া সঙ্গিনী ছিল। বাউলদের বিশ্বাসমতে শ্রী চৈতন্য আউলচাঁদরূপে জন্ম নিয়ে এই গূহ্য সাধনপ্রণালী মানুষের মধ্যে প্রচার করেন। জনশ্রুত অনুপাতে আউলচাঁদের জন্ম যেহেতু মুসলমান গৃহে ছিল ওদিকে দীক্ষা নিয়েছেন বৈষ্ণব ধর্মে আর প্রচার করেছেন দেহতত্ব। তাই লোকবিশ্বাস ও জনশ্রুতিতে তার থেকেই ইসলাম, বৈষ্ণব ও দেহতত্ত্ব একাকার হয়ে যায়।[6]

সাধক ও সাধিকার ধারা চৈতন্য থেকেই নয় বরং রাধা-কৃষ্ণ, সীতা-রাম, পার্বতী-শীব; সবার ক্ষেত্রেই এ ধারা প্রজোয্য হয়। আমরা যদি লালন সাধনার স্বরূপ দেখতে চাই, তবে সে একই চিত্র গোচর হয়। গবেষক সোমব্রত সরকার—যিনি দীর্ঘদিন লালন সাধকদের সংস্রবে থেকে ‘লালনের সাধনসঙ্গিনী’-নামক বইয়ে তার স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি লেখেন: “লালনের ঘরে প্রধান বিষয়টি হল গিয়ে রজঃসাধনা। যেখানে সাধনসঙ্গিনী অনিবার্য। সাধনসঙ্গিনী ছাড়া লালন ঘরের সাধনা কোনওভাবেই চলতে পারে না। সেজন্যই ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে সাধকের সকলেই সাধনসঙ্গিনী সহযোগে গুরু লালন সাঁইয়ের সঙ্গে বাস করতেন। …. আখড়াবাড়িতে থাকতেন ভাঙ্গুরী ফকিরানি, কামিনী ফকিরানি, প্যারী নেছা, শান্তি ফকিরানি।” এরপর তিনি ভোলাই শাহের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন যে, তার মা অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় তার বাবা ভাদু শাহ তাকে লালনের আখড়াবাড়িতে রেখে যান। লালন তাকে ছেলের মতো লালনপালন করেন। অনুরূপ প্যারি নেছাও ছোটবেলা থেকে লালনের মেয়েরূপেই আখড়াবাড়িতে বেড়ে হোন। উভয়কে সাধন উপযোগী বানিয়ে পরস্পরকে একত্রে সাধনার অনুমোদন দেন।

অনুরূপ মনিরুদ্দিন শাহ। যিনি বিয়ের পর সন্তান-সন্ততি হলে লালনের শিষ্য হোন। তার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও লালন পাঁচিকে তার সাধনসঙ্গিনী বানিয়ে দেন। সোমব্রত সরকার লালন সাধনায় সাধন সঙ্গিনীর গুরুত্ব বুঝাতে লেখেন যে, “লালন ঘরে রজঃসাধনায় ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে সাধক-সাধিকাদের একত্রবাস অনুমোদিত ছিল। একত্র বাস না হলে অটল বেহার হবেই বা কী করে?

এটা তো গেল দেহকেন্দ্রিক সাধনার একটা চিত্র। যার মৌলিকত্ব বস্তু সাধনা। অর্থাৎ বাউলরা বস্তুবাদী। আর এ বস্তুর পাঠ হলো আধ্যাত্মবাদ। তবে বাউলদের আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে ইসলামের আধ্যাত্মবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের আধ্যাত্মবাদ নিজের আত্মার উন্নয়ন ও আল্লাহ তায়ালার দিকে ধাবমানতার এক মসৃণ পথ। আর বাউলদের আধ্মাত্যবাদে আল্লাহ তায়ালা ও তার বিধানাবলীর কোনো স্থান নেই। কেননা তারা অদৃশ্য কোনো সত্ত্বায় বিশ্বাস করে না। তাদের কাছে অতিপ্রকৃত শক্তি হলো তাদের মানুষ গুরু। বাউলবাদের সবই বর্তমান। তাই তারা আখিরাতেও অবিশ্বাসী।


[1] বঙ্গে সূফী প্রভাব: ১২৯-৩০

[2] বৈষ্ণবদের বিশ্বাসমতে পূর্ণ শক্তির রাধা ও পূর্ণ শক্তির কৃষ্ণ এক দেহে মিলিত হয়ে নবদ্বীপে গৌরঙ্গ তথা শ্রী চৈতন্য রূপেআবির্ভূত হয়। চৈতন্যকে গৌরঙ্গ বলার অন্যতম কারণ সে রাধার মতো গৌর বর্ণ হয়েছিল। তাই চৈতন্য নিজেকে রাধাজ্ঞান করে কৃষ্ণের প্রেমে পাগল হইত। (ভারতবর্ষে উপাসক সম্প্রদায়: ১৫৯-১৬০)

[3] কর্তা অর্থ ঈশ্বর আর ভজা অর্থ শরীর। অবশ্য তাদের কাছে এই কর্তা হলেন আউল চাঁদ। আর এই আউল চাঁদকে মুসলমান বলা হলেও তিনি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কর্তাভজাদের পরিপূর্ণ বাউল বলা না হলেও তারাও বাউলদের মতো দেহসাধনায় বিশ্বাসী।

[4] প্রাচ্য ও পাশ্চত্ত্য দর্শনের ইতিহাস: ১৪৫-৪৬

[5] বাউলতত্ত্ব: ১৪ পৃ.।

[6] https://shorturl.at/pleW4



Leave a comment