
(চতুর্থ পর্বের লিংক: https://wp.me/pgP0Ho-4y
শিয়াদের কিতাবে সাবাপুত্র ও তার কর্ম
আল মাকালাত ওয়াল ফিরাক গ্রন্থকার সা’দ বিন আবদুল্লাহ আল কুম্মি লেখেন: সর্বপ্রথম যে বলেছিল আলি হত্যা হন নি, মৃত্যুবরণ করেন নি, মৃত্যুবরণ করতে পারেনও না—যতদিন না তিনি পুরো পৃথিবীর কতৃত্ব গ্রহণ করবেন আর যতক্ষণ না তিনি আরবদের সম্পূর্ণ আনুগত্যে বাধ্য করবেন। পৃথিবী যেমন অন্যায় ও যুলুম দ্বারা পূর্ণ, তেমনই তিনি তা ন্যায় ও ইনসাফ দিয়ে পূর্ণ করবেন। এ জাতীয় চরমপন্থী কথা যারা বলেছিল, তারা সাবায়ি ফিরকা—আবদুল্লাহ বিন সাবার অনুসারী। সেই সর্বপ্রথম আবু বকর, উমর, উসমান—এমনকি সমস্ত সাহাবাদের ব্যাপারে অসংলগ্ন কথা বলে তাদের থেকে মুক্ততা ঘোষণা করেছিল। সে দাবি করেছিল আলি আ. তাকে এসব বলেছিল। এরপর আলি আ. তার থেকে এ বিষয়ের স্বীকরক্তি নিয়ে হত্যা করতে চাইলে লোকজন বললো: আমিরুল মু’মিনিন আপনি এমন কাউকে হত্যা করতে চান, যে আপনাদের আহলে বাইত ও আপনার বেলায়েত বা কতৃত্বকে ভালোবাসে বলে দাবি করে? সে সঙ্গে আপনার শত্রুদের থেকে মুক্ততা ঘোষণা করে? তখন আলি রাদি. তাকে মাদায়ানে পাঠিয়ে দেন।
এরপর কুম্মি লেখেন: আহলুল ইলমদের বড় একটি দল বলেন যে, আবদুল্লাহ বিন সাবা ইয়াহুদি ছিলেন। পরে ইসলাম গ্রহণ করে আলির প্রতি আনুগত্যতা প্রকাশ করেন। তিনি ইয়াহুদি থাকাকালীন ইউশা বিন নুনকে মুসা আ. এর ওয়াছি বলতেন আর ইসলাম গ্রহণের পর আলি আ.-কে রাসুলের ওয়াছি বলেন। তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি আলি আ. এর ইমামত ফরয হওয়ার কথা বলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তার শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের কাফের বলেন। তাই শিয়া বিরোধিরা বলে থাকে যে, রাফেযিদের ভিত্তি ইয়াহুদিদের থেকে উৎসারিত।
ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের দেশন্তরিত করে মাদায়ানে প্রেরণ করার পর এক ব্যক্তি সেখানে গেলে লোকজন জিজ্ঞেস করল: আমিরুল মুমিনিনের কি অবস্থা? সে বললো: এক দুর্ভাগা তাকে আঘাত করার ফলে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আবদুল্লাহ বিন সাবার কাছে এ সংবাদ পৌঁছালে সংবাদদাতা সম্পর্কে সে বললো, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। আমার কাছে তার কর্তিত মস্তক এনে সত্তরজন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিও যদি সাক্ষ দেয়, তবুও আমি তা বিশ্বাস করব না। কেননা আমি জানি, তিনি মৃত্যু বরণ করতে পারেন না, হত্যাও হতে পারেন না। তিনি ততক্ষণ অবধি মৃত্যুবরণ করবেন না, যতক্ষণ না আরবদের বাধ্যগতভাবে অনুগত বানাবেন আর পুরো পৃথিবী শাসন করবেন। …. এটাই সাবায়িদের মাযহাব। তারা আলি আ. সম্পর্কে বলতেন: তিনি বিশ্বজগতের উপাসক। এখন তার সৃষ্টির উপর অসন্তোষবশত দৃষ্টির আড়াল হয়েছেন। অচিরেই আবার তিনি প্রকাশ পাবেন।[1] আবদুল্লাহ বিন সাবা সম্পর্কে এসব বর্ণনা শিয়াদের প্রায় প্রতিটি রিজালের কিতাবেই রয়েছে। সবগুলোর বিষয়বস্তু এক হওয়ায় সংক্ষিপ্ততার জন্য এ একটার উপরই ক্ষন্ত করছি।
সাবায়ি; ইসলামের প্রথম ফিরকা
ঐতিহাসিক ও ফিরাকে বাতিলা বিষয়ক গবেষকগণ খারেজি সম্প্রদায়কে ইসলামের প্রথম ফিরকা বলে উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে কেউ কেউ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত যুল-খুওয়াইসারর[2] হাদিসকে দলিল হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন আবার কেউ ৩৭ হিজরি আলি রাদি. এর বাহিনী থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া জামাআতকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন। কিন্তু আমার কাছে ইসলামের প্রথম ফিরকা সাবায়ি। আবদুল্লাহ বিন সাবা আলাদা এক ধর্মীয় রূপরেখা নিয়েই স্বীয় মতবাদীয় দাওয়াত শুরু করেন। যারা মদিনায় এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তৃতীয় খলিফাকে হত্যা করে এরপর জঙ্গে জামাল সৃষ্টি করে। জঙ্গে সিফফিন সংঘঠনেও বড় ভূমিকা রাখে। অবশ্য খারেজিরা আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমানদের জামাত থেকে পৃথক হয়েছিল। কিন্তু তারাও যে মদিনার বিদ্রোহ, জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে শরিক হয়েছিল, তাও কিন্তু আবদুল্লাহ বিন সাবারই অবদান। তার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মুসলমানদের মধ্যে বিষয়টি অকল্পনীয় ছিল। হ্যাঁ, খারেজিদের সঙ্গে সাবায়িদের পার্থক্য হলো, সাবায়িরা প্রথম আকিদাগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে আর খারেজিরা দলগতভাবে। অবশ্য শিয়া ফিরাক বিষয়ক গবেষকগণ শিয়া সম্প্রদায়কেই ইসলামের প্রথম দল বলে অবহিত করেছে।[3] আর এটা তো অনস্বীকার্য যে, শিয়াবাদের উত্থান সাবাপুত্রের হাত ধরেই হয়েছে।
চলবে…
[1] কুম্মি: আল মাকালাত ওয়াল ফিরাক: ১৯-২১
[2] রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন কোনো কিছু বণ্টন করছিলেন। তখন বনি তামিমের এক ব্যক্তি, নাম যুল খুওয়াইসিরা, এসে বলল— “হে মুহাম্মদ! আপনি ন্যায়বিচার করুন।” এ কথা শুনে নবি ﷺ বললেন, “ধ্বংস হোক তোমার! আমি যদি ন্যায় না করি, তবে আর কে ন্যায় করবে? আমি যদি অন্যায়কারী হই, তবে তো আমি ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত।”
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি. বললেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি যেন এই মুনাফিকের ঘাড় উড়িয়ে দিই।” নবি ﷺ বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও। কারণ, এর মতো কিছু লোক হবে, যাদের নামাজ ও রোযা দেখে তোমরা নিজেদের ইবাদতকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের গলার নিচে নামবে না। তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর পশুর দেহ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। তারা এমন সময়ে বের হবে, যখন মানুষের মধ্যে বিভেদ দেখা দেবে।” এরপর নবী ﷺ তাদের মধ্যে এক ব্যক্তির লক্ষণ বর্ণনা করেন— তার এক হাতে মাংসের গুটির মতো অংশ থাকবে, যা নারীর স্তনের মতো ঝুলে থাকবে। পরবর্তীতে সাহাবিরা খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেই ব্যক্তিকে দেখতে পান ঠিক নবি ﷺ যে লক্ষণ বলে দিয়েছিলেন। বুখারি: ৬৯৩৩, মুসলিম: ১০৬৪।
[3] সা’দ আল কুম্মি: আল মাকালাত ওয়াল ফিরাক: ১৫ পৃ.।

Leave a comment