গদিরে খোমের প্রেক্ষাপট ও মূল ঘটনা
নাসায়ি, ইবনু মাজা, মুসনাদু আহমাদ ও আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার সব বর্ণনার সমষ্টির সারাংশ হলো, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানের শাসনকর্তারূপে প্রেরণ করে হযরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সেখানকার খুমুস বা গনিমতের একতৃতীয়াংশ আদায় করতে পাঠালেন। কোনো কোনো বর্ণনামতে সেখানে তাকে শাসক ও বিচারক হিসেবেই প্রেরণ করেছিলেন। বিদায় হজেরকালে যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় পৌঁছালেন, তখন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে মিলিত হয়ে হজ করার জন্য তার সাথীদের মধ্যে থেকে একজনকে আমির বানিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে এলেন। তবে পথে সাথীরা কিছু ব্যথীত হয়েছিল। অথচ এ ক্ষেত্রে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুই সঠিক ছিলেন।
গদিরে খোম! আমাদের কাছে অপরিচিত একটি শব্দ হলেও প্রতিটি শিয়ার হৃদয়ে বদ্ধমূল একটি বিশ্বাস। এ বিশ্বাসই তাদের ইমামতের ভিত্তি। ইমামত পূর্ণতার দিবস হিসেবে তারা ১৮ই জিলহজকে গদির দিবস বা ঈদে আকবর তথা সকল ঈদের বড় ঈদ হিসেবে উদযাপন করে। এ রাতে তারা আনন্দের জন্য দল বেধে মুতা বিয়ের নামে ওপেন জেনার আয়োজন করে থাকে। যদিও এ ঈদের সূচনা হয়েছে ৩৫২ হিজরি। কিন্তু আমাদের পর্যবেক্ষণ বলে, গদির দিবস বলতে শিয়ারা কোনো দিবসই পালন করে না। বরং ১৮ই জিলহজ উসমান রাদি.-এর শাহাদাত উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন করে। যা তাকিয়াবশত গদির দিবসের নামে প্রচার করে। পাকিস্তানের শিয়া সদর মুহাম্মদ হাসনাইন নাজফি আমাদের এ তথ্যই প্রদান করেন।
ঘটনা হলো: যখন তারা রওনা হলো তখন সাথীরা তার কাছে আবেদন জানালেন যে, আমাদের উট দুর্বল হয়ে গেছে। স্বাচ্ছন্দে চলতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে আপনি যদি আমাদের চলার জন্য খুমুছের উট প্রদান করতেন, তবে চলতে সহজ হতো। কোনো কোনো বর্ণনামতে তারা খুমুসের পোশাক থেকে নতুন পোষাক চেয়েছিল। কিন্তু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু দিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে তারা তার উপর মনঃক্ষুণ্ণ হোন। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য তাদের মধ্যে থেকে একজন আমির নিযুক্ত করে চলে আসেন। হজ শেষে আবার তাদের সঙ্গে মিলিত হলে দেখলেন যে, তারা সাওয়ারিরূপে খুমুসের উষ্ট্রি কিংবা বর্ণনা ভিন্নতায় জোরা কাপড় পরহিত অবস্থায় রয়েছেন। তাই তিনি তাদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সবার থেকে কাপড় বা উষ্ট্রি নিয়ে নেন। তার এ আচরণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার নামে অভিযোগ করেন। তখন খোম জলাশয় বা গদিরে খোমের কাছে এসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সে স্থান পরিস্কারের নির্দেশ দেন এবং জোহরের নামায পড়েন। নামাযান্তে তিনি সংক্ষিপ্ত একটা ভাষণ প্রদান করেন। যার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলো কেবল আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহত্ম্য ফুটিয়ে তোলা এবং ইয়ামেনে তার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের বিরূপ সমালোচনার জবাবে তার নির্দোষিতা ও সাফাই বর্ণনা করা। তিনি বলেন:
كأنى قد دعيت فاجبت- إنى قد تركت فيكم الثقلين كتاب الله و عترتى اهل بيتى- فانظروا كيف تخلفونى فيهما- فإنهما لن يفترقا حتى يردا على الحوض.
‘মনে হয় আমি (পৃথিবী হতে বিদায় নেওয়ার জন্য) আহূত হয়েছি এবং আমি (তাতে) সাড়াও দিয়েছি। আমি তোমাদের মধ্যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রেখে যাচ্ছি: আল্লাহর কিতাব ও আমার ইতরাত বা আহলে বাইত। তাই লক্ষ করবে যে, আমার অবর্তমানে এ দু বিষয়ে তোমাদের আচারণ কেমন হয়। কেননা এ দুটো হাউয (কাউসারে) উপনীত হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই বিচ্ছিন্ন হবে না।’ এরপর বললেন: “ الله مولائى وانا ولى كل مؤمن” ‘আল্লাহ আমার বন্ধু ও অভিভাবক আর আমি প্রতিটি ঈমানদারের বন্ধু ও অভিভাবক।’ এরপর তিনি হযরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরে বললেন:
من كنت مولاه فهذا وليه- اللهم وال من والاه وعاد من عاداه
‘আমি যার বন্ধু ও অভিভাবক এ (আলি)ও তার বন্ধু ও অভিভাবক। হে আল্লাহ! তাঁর সাথে যে বন্ধুত্ব রক্ষা করবে, আপনি তার বন্ধু হোন আর যে তার বিরোধীতা করবে, আপনি তার বৈরী হোন।’ এটা হলো নাসায়ির বর্ণনা। আর ইবনু মাজার বর্ণনানুপাতে নামাযান্তে তিনি হযরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরে বললেন:
ألست بأولى بالمؤمنين من أنفسهم؟ قالو بلى! قال: ألست بأولى بكل مؤمن من نفسه؟ قالوا: بلى! قال: فهذا ولى من انا مولاه، اللهم وال من والاه وعاد من عاداه
আমি কি প্রত্যেক মুমিনের কাছে তাদের নিজেদের চাইতেও আপন নই? সাহাবাগণ বললেন: জী, নিশ্চয়! তিনি আবার বললেন: আমি কি প্রত্যেক মুমিনের কাছে তার নিজের চাইতে অধিকতর আপন নই? সাহাবাগণ বললেন: জী, নিশ্চয়। তখন তিনি বললেন: তবে আমি যাদের আপন এ (আলি)ও তাদের আপন। হে আল্লাহ! তাঁর সাথে যে বন্ধুত্ব রক্ষা করবে, আপনি তাঁর বন্ধু হোন আর যে তাঁর বিরোধীতা করবে, আপনি তার বৈরী হোন। ’
তবে মুসনাদু আহমাদের এটা অতিরিক্ত রয়েছে যে, “وانصره من نصره واخذل من خدله” ‘যারা তার সাহায্য করবে আপনি তাদের সাহায্য করুন আর যারা তাঁর সাহায্য বর্জন করবে, আপনি তাদের সাহায্য বর্জন করুন।’
তবারি রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন: (রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষণের শেষে) উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাত করে বললেন: মুবারকবাদ। আপনি তো সকাল সন্ধায় প্রত্যেক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর বন্ধু ও আপনজন হয়ে গেলেন।
এটাই হলো গদিরে খোম সম্পর্কে সমস্ত রেওয়ায়েতের সারমর্ম। যার বিস্তারিত বিবরণ আপনারা আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ৫ম খন্ডে দেখে নিতে পারেন।
গদিরে খোম সম্পর্কিত হাদিসের ব্যপারে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত ও শিয়াদের অভিমত
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অভিমত:
এ ক্ষেত্রে আমি কেবল আহমাদ ইবনু হজর আল হাইতামি আল-মাক্কি এবং হাফিয ইবনু হজর আল আসকালানি রহিমাহুমাল্লাহ-এর অভিমত উল্লেখকে যথেষ্ঠ মনে করছি। ইবনু হজর হাইতামি শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ স্বীয় ‘আস-সাওয়ায়িকুল মুহরিকা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
وبيانه أنه حديث صحيح لامرية وقد اخرجه جماعة كالترمذى والنسائى وأحمد وطرقه كثيرة جدا، ومن ثم رواه ستة عشر صحابيا، وفى رواية لأحمد أنه سمع من النبى صلى الله عليه وسلم ثلثون صحابيا، وشهدوا به لعلى لما نوزع أيام خلافته، كما مر وسيأتى، وكثير من أسانيدها صحاح وحسان، ولا إلتفات لمن قدح فى صحته ولالمن رده، بأن عليا كان باليمن لثبوت رجوعه منها وإدراكه الحج مع النبى صلى الله عليه وسلم، وقول بعضهم إن زيادة ” اللهم وال من والاه ” الخ موضوعة مردود، فقد ورد ذلك من طرق صحح الذهبى كثيرا منها.
এই হাদিস নিঃসন্দেহে সহিহ। ইমাম তিরমিযি, নাসায়ি ও আহমাদ রহিমাহুমুল্লাহদের মতো মুহাদ্দিসিনদের একটি জামাত এটা বর্ণনা করেছেন। এই হাদিসের অনেক সনদ রয়েছে। ১৬জন সাহাবি এই হাদিসকে বর্ণনা করেছে। মুসনাদু আহমাদের এক বর্ণনামতে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ৩০জন সাহাবি এই হাদিস শুনেছেন। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে যখন তাঁর বিরোধীতা করা হলো, তখন ওই সাহাবারা এই হাদিসের সাক্ষি দিয়েছেন। এর অনেক সনদ সহিহ ও হাসান স্তরের। তাই যে ব্যক্তি এই হাদিসের শুদ্ধতার ব্যপারে প্রশ্নোত্থান করে, তার কথা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের এ কথাও অসমর্থিত যে, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন ইয়ামান ছিলেন। কেননা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইয়ামান থেকে ফিরে এসে বিদায় হজে শরিক হওয়া প্রমাণিত। আর যারা বলে যে, ” اللهم وال من والاه ” এর বৃদ্ধিকরণ মওযু বা জাল, তাদের কথাও অগ্রহণযোগ্য। কেননা এ বৃদ্ধিকরণ অনেক সনদ দ্বারা প্রমাণিত। যার অধিকাংশ সনদকে ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ সহিহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[1]
وأما حديث “من كنت مولاه فعلى مولاه” فقد أخرجه الترمذى والنسائى، وهو كثير الطرق جدا، وقد استوعبها ابن عقدة فى كتاب مفرد، وكثير من أسانيدها صحاح وحسان.
“من كنت مولاه فعلى مولاه” এই হাদিসটি ইমাম তিরমিযি ও নাসায়ি রহিমাহুমাল্লাহ বর্ণনা করেছেন এবং অনেক সনদে বর্ণিত। ইবনু উকদা একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থে এই সব তুরুক একত্রিত করেছেন। এই হাদিসের অনেক সনদ সহিহ এবং হাসান স্তরের।[2]
অর্থাৎ গদিরে খোমের এই হাদিস ১৬ জন সাহাবা থেকে বর্ণিত এবং সহিহ। কিন্তু এই হাদিস থেকেই খিলাফত ও ইমামত সাব্যস্ত করা ভুল। কারণ এ সম্পর্কে এখানে সামান্য ইঙ্গিতও নেই। যার বিস্তারিত আলোচনা সামনে করবো ইন শা আল্লাহ।
শিয়াদের অভিমত:
হিজরি ১১তম শতাব্দির প্রখ্যাত শিয়া আলিম মোল্লা বাকের মাজলিসি; শিয়ারা যাকে হুজ্জাতুল্লাহ, ফখরুল উম্মাহসহ অগনিত উপাধিতে ভূষিত করে থাকে। তিনি স্বীয় গ্রন্থ হক্কুল ইয়াকিন-এ লেখেন যে, এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিস মুতাওয়াতির ও মুত্তাফাক আলাইহি। যা ১২০ জন সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে। তার দাবিমতে মক্কা ও মদিনার দাবি ও অস্তিত্ব যেমন মুতাওয়াতির, তদ্রুপ এটাও মুতাওয়াতির।[3] তিনি তার ১১০ খন্ড সম্বোলিত বিহারুল আনওয়ার গ্রন্থে লেখেন যে, গদির সম্পর্কিত হাদিসের সংখ্যা এতো বেশি যে, তা এখানে উল্লেখের অবকাশ নেই। এমনকি শিয়ারা শুধু এই বিষয়েই অসংখ্য কিতাব লেখেছে। এ বিষয়ের হাদিস সংখ্যা কত হতে পারে, তা মোল্লা বাকের মাজলিসি হক্কুল ইয়াকিন গ্রন্থের ১/১২৫ পৃষ্ঠার একটা উক্তি নকল করলেই বুঝতে পারবো। মাজলিসি লেখেন: আবুল মায়ানি জুফি বড় বিস্ময় প্রকাশ করে বলে যে, ‘আমি বাগদাদের কিতাবের দোকানগুলো থেকে কোনো এক দোকানে একটি কিতাব দেখেছি, যার মধ্যে গদিরে খোমের হাদিসগুলো জমা করা হয়েছিলো। যার পেছনে লেখা ছিলো “من كنت مولاه فعلى مولاه”। আর তা ছিলো ২৮ খন্ড সম্বলিত। এমনকি তা ২৯ খন্ডও হয়ে গিয়েছিলো।’ ইয়া লাল আজাব! তাহলে সেখানে কত হাজার হাদিস হতে পারে? এ সম্পর্কে এতো এতো হাদিস কি শুধু আগেই লেখা হতো! না, বর্তমানও এর ধারাবাহিকতা বিদ্যমান। এই তো গতশতাব্দির শিয়াদের হিবরুল ইলম ওয়াল হুজ্জাহ খ্যাত আবদুল হুসাইন আহমাদ আল আমিনি আন-নাজাফি ‘আল গাদিরু ফিল কিতাবি ওয়াসসুন্নাতি ওয়াল আদবি’ নামে একটি কিতাব রচনা করেন। এ কারণে শিয়ারা আবদুল হুসাইন বা হুসাইনের বান্দা নামখ্যাত এই ব্যক্তিকে শাইখুনাল আকবার বলেও সম্বোধন করে থাকে। তার লেখিত ওই কিতাবটি ১১ খন্ডের। পাঠক! আশ্চর্য হচ্ছেন? যেখানে ইবনু আসাকির রহিমাহুল্লাহ তাঁর ৮০ খন্ডের বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ ‘তারিখু মাদিনাতি দিমাশক’-এ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফাযায়েল ও মানাকিব সম্বলিত হাদিসসমুহ সমস্ত সনদ ও তুরুকসহ কেবল ৫৮৭ পৃষ্ঠার একটা খন্ডে সমাপ্ত করেছেন, সেখানে তাকে কেন্দ্র করে একটা বিষয়ের হাদিসই ২৯ খন্ড, আবার ১১ খন্ডও? কল্পনা করেছেন কখনো! আর আমার সংক্ষিপ্ত এই প্রবন্ধে এত বিশাল সমুদ্রের খন্ডনও কি সম্ভব? তবুও সামান্য চেষ্টা করবো।
সমুদ্রসম এসব হাদিস আবিস্কারের তথ্য
শিয়াদের সমুদ্রসম এতো হাদিস পরিমাপের জন্য প্রথমে আমি একটা মূলনীতি উল্লেখ করবো। যেটা পড়ে ইন শা আল্লাহ আপনারাই তাদের হাদিসগুলো পরিমাপ করতে পারবেন। আবুল হাসান আলি ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আররাক আল কিনানি রহিমাহুল্লাহ (৯০৭-৯৬৩ হি.) স্বীয় কিতাব ‘তানযিহুশ শরিয়াতিল মারফুয়া আনিল আহাদিসিশ-শানিয়াতিল মাওযুয়া’-এ লেখেন:
قال الخليلى فى الإرشاد: قال بعض الحفاظ تأملت ماوضعه أهل الكوفة فى فضائل على وأهل بيته فزاد على ثلثمأة ألف. الله اعلم.
‘খলিলি স্বীয় ইরশাদ গ্রন্থে লেখেন: কোনো এক হাফিযে হাদিস বলেছেন: আমি গভীর পর্যাবেক্ষণ করে দেখেছি যে, কুফাবাসী আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তার আহলে বাইত সম্পর্কে যেসব হাদিস জাল করেছে, তার সংখ্যা তিন লক্ষেরও অধিক।’[4]
আল ইয়াযু বিল্লাহ! শিয়ারা শুধু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আহলে বাইতের ফযিলত সাব্যস্ত করতেই এতোটা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে! ভাবা যায়! আর এর সবগুলোই হয়তো নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে আজমাঈন ও কথিত ইমামদের দিকে সম্পৃক্ত করেছে।
আসলেই কি এসব হাদিস শিয়ারা তাদের কথিত সেসব ইমামদের থেকে বর্ণনা করতো? যদি বর্ণনা করেই থাকে, তবে আহলে বাইতের এসব মুকাদ্দাস ব্যক্তিগণ মুসলমান থাকেন কি করে? সবার মনেই হয়তো এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আমাদের আকিদা হলো, আহলে বাইতের এসব ব্যক্তিগণ আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন। শিয়াদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। মূলত শিয়াদের অধিকাংশ হাদিসের ভিত্তি যুরারা ইবনু আ’উন ও আবু বছির প্রমুখদের উপর। ইবনু সাবার এসব ভাবশিষ্যরা নিজেদের জাফর সাদিক ও বাকির রহিমাহুমাল্লাহর প্রিয়জন বলে প্রচার করতো। এরাই তাদের থেকে হাদিস বর্ণনা করতো। একারণে শিয়াদের দুই তৃতীয়াংশেরও অধিক হাদিস এ দুইজন থেকে বর্ণিত। আর ফিকহের ক্ষেত্রেও ওদের দাবি যে, ওরা ফিকহে জাফরি বা জাফর সাদিকের ফিকাহ অনুসরণ করে। যাইহোক! এই বুযুর্গদ্বয় মদিনায় অবস্থান করতেন আর ওরা কুফায়। ওরা মদিনায় এসে তাদের থেকে হাদিস শুনে এসেছে বলে প্রচার করতো অথচ এটা ছিলো পুরোই মিথ্যা। আর এই মিথ্যাকে গোপন করার জন্যই ওরা তাকিয়া বা মুনাফিকির আবিস্কার করে যে, তারা আমাদের ঘনিষ্ঠজন বিধায় এসব হাদিস প্রকাশ করেছে। তোমরা গিয়ে জিজ্ঞেস করলেও তারা তাকিয়াবশত এটা অস্বীকার করবে। ঠিক এই মিথ্যার উপরই ওদের ধর্ম চলে আসছিলো। এবং সর্বশেষ ১১তম ইমাম হাসান আসকারিকে নিয়েও ওরা মিথ্যা প্রচার করলো যে, তার সন্তান মুহাম্মাদ আল মাহদি ১২তম ইমাম। যে ৪ বছরের বয়সে কোনো এক গুহায় আত্মগোপন করেছে এবং সত্তর বছর অবধি তার ঘনিষ্ঠ উঁচু মাপের শিয়া চারজন দূতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছে আর তাদের মাধ্যমে শরয়ি মাসআলার সমাধান দিয়েছে। আর চারজন একসঙ্গে ইমামের সঙ্গে যোগাযোগ করে নি বরং একজনের ইন্তেকালের সময় নিজেরাই আরেকজনকে নির্দিষ্ট করে দিতেন। আর তিনিই ইমামের পক্ষ থেকে শিয়াদের থেকে খুমুস আদায় করতেন।
এই চারজনের সঙ্গে যোগাযোগের ৭০ বছরকে বলা হয় গায়বাতে সুগরা-এর সময়কাল। পরবর্তীতে তিনি একেবারে অন্তর্হিত হয়ে যান। এখনো তার কোনো খোঁজ-খবর নেই। কিয়ামতের পূর্বে তিনি আগমন করবেন। আর এটাকেই বলে গায়বাতে কুবরা। অথচ সমস্ত ইতিহাসবিদ একমত যে, হাসান আসকারির কোনো সন্তান হয় নি। এমনকি তার ইন্তেকালকালে তার কোনো স্ত্রী বা বাদি গর্ভবতীও ছিলেন না। এ জন্যই তার সহোদর ভাই জাফর ইবনু আলি তার উত্তরাধিকার স্বত্ত্ব লাভ করেছিলেন। আসলে এই চার দূতই ছিলো বড় মিথ্যুক। গায়বাতে সুগরা বলতেও কিছুই ছিলো না। তাই যখন এক এক করে তাদের সময় ফুরিয়ে এলো, আর নিজেদের মতো ধূর্ত কারো সন্ধানও পেলো না; তখন গায়বাতে কুবরার নাটক করল। কেননা যোগাযোগের ধারাবাহিকতা জিইয়ে রাখলে তাদের মিথ্যা, ধোকা ও প্রতারণার মুখোশ খুলে যেত। তাই বলে দিলেন এখন আর ইমাম কারো সঙ্গে দেখা করবেন না। সবচেয়ে আশ্চর্যর ব্যপার হলো, একজনের বাচ্চা হলো, চার পাঁচ বছর অবধি লালিত পালিত হলো, অথচ তার পাশের ঘরের কেউই টের পেলো না!
শিয়াদের কিতাবে বর্ণিত গদিরে খোম
শিয়াদের গ্রন্থ থেকে গাদীরে খোম বর্ণনা করতে গেলে বড়সড় একটা গ্রন্থ হয়ে যাবে। আমি শুধু ওদের বিভ্রান্তি বুঝানোর জন্য কেবল মোল্লা বাকের মাজলিসির হাক্কুল ইয়াকিন থেকে সংক্ষিপ্ত একটা ঘটনা উল্লেখ করছি।
মোল্লা বাকের মাজলিসি ‘কিতাবুন নাশরি ওয়াল আলি’ থেকে বর্ণনা করেন: আল্লাহ তাআলা যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এই আয়াত নাযিল করেন:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের কাছে তাদের জানের থেকেও উত্তম। তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মা। আর তার রক্তের আত্মীয় আল্লাহ তাআলার কিতাবমতে কতক মুমিন ও মুহাজির থেকে উত্তম। (কিতাবের অনুবাদের ভাষ্য) সাহাবগণ বললো: সেই বেলায়েত কী! যার কারণে আপনারা আমাদের প্রাণের থেকে বড় হকদার? রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমাদের ইচ্ছে হোক বা না হোক, আমাদের কথা শুনবে আর মানবে। তখন সাহাবাগণ বললেন: আমরা শুনবো ও আনুগত্য করবো। অতঃপর এই আয়াত নাযিল করলেন: “وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمِيثَاقَهُ الَّذِي وَاثَقَكُمْ بِهِ إِذْ قُلْتُمْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا” তোমাদের উপর আল্লাহ তাআলার নিয়ামত ও সে অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের উপর বিধিবদ্ধ ও দৃঢ় করেছি; যখন তোমরা বলেছিলে যে, আমরা শুনেছি ও আনুগত্য করেছি।’ আর এসব ঘটনা মদিনায় সংঘঠিত হয়েছিল। অতঃপর আমরা বিদায় হজের জন্য মক্কায় গেলাম। সেখানে জিবরিল এসে বললেন: আপনার পালনকর্তা আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন: আপনি লোকদের পথপ্রদর্শক ও নেতা হিসেবে আলিকে মনোনীত করুন। এটা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাড়ি মুবারক ভিজে গেলো। তিনি বললেন: হে জিবরিল! আমার সম্প্রদায় জাহিলিয়াত ও কুফুরের নিকটতম যুগে অবস্থান করছে, আমি কেবল তরবারির জোরে তাদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছি। তাই তারা আমার আনুগত্য করেছে। যখন আরেকজনকে তাদের শাসক বলে স্বীকৃতি দিবো, তখন তাদের অবস্থা কি হবে? এটা শুনে জিবরিল চলে গেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি আলাইহিস সালামকে বিদায় হজের আগেই ইয়ামান পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সেখান থেকে এসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হলেন। একদিন আলি আলাইহিস সালাম মক্কার নিকটে নামায পড়তে ছিলেন। যখন রুকুতে গেলেন এবং এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইলো, হযরত আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আংটি তাকে দিয়ে দিলেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো: “ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ” যেটা তাঁর শানে অবতীর্ণ আয়াতসমুহের অধীনে উল্লেখ করেছি। ফলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহু আকবর বলে আমাদের সে আয়াত শুনিয়ে বললেন: উঠো! দেখি আসি যে, এই আয়াতে আল্লাহ যার গুনাবলী আলোচনা করেছেন, তা কার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। যখন তিনি মসজিদে প্রবেশ করলেন, তখন এক ভিক্ষুককে বের হতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথার থেকে আসছো? বললো: ওই নামাযি ব্যক্তির কাছ থেকে। সে রুকু অবস্থায় আমাকে এই আংটি দিয়েছে। এটা শুনে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন এবং আলি আলাইহিস সালামের কাছে এসে বললেন: হে আলি, আজ তুমি কোন কল্যাণের কাজ করেছো? আমিরুল মুমিনিন আলাইহিস সালাম আংটির কথা বললেন। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয়বার আল্লাহু আকবার বললেন। এটা দেখে মুনাফিকরা (উদ্দেশ্য আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) একজনর আরেকজনের দিকে তাকাতে লাগলো এবং বললো: এ দৃশ্য আমাদের সহ্য হচ্ছে না যে, সে আমাদের শাসনকর্তা হবে।[5] আমরা রাসুলের কাছে গিয়ে বলি যে, তার পরিবর্তে অন্য কাউকে দেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যখন এ কথা বলা হলো, তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন: “قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي” এই আয়াত মতে এর ব্যাখ্যা এই যে, যারা কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস রাখে না, তাদের যখন সুস্পষ্ট আয়াত শুনানো হয়, তখন তারা বলে: এই কুরআনের পরিবর্তে আমাদের ভিন্ন কুরআন এনে দেন কিংবা এ কুরআন থেকে আলির আলোচনা বের করে দেন। হে রাসুল তাদের বলে দিন, আমার দ্বারা এটা সম্ভব না যে আমি তাকে স্বীয় মর্জি মোতাবেক পরিবর্তন করে দিবো। আমি তো তারই অনুসরণ করি, যা আমাকে প্রত্যাদেশ করা হয়। আমি যদি আমার পালনকর্তার নাফরমানি করি, নিঃসন্দেহে আমি এরচেয়ে বড় শাস্তিকে ভয় পাই। ওইসময় পুনরায় জিবরিল এসে বললো: ইয়া রাসুলাল্লাহ! আলির খিলাফতের ব্যপারে পরিপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে দেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে জিবরিল! তুমি আগে এ ব্যপারে মুনাফিকদের অভিমত শুনো। এটা শুনে সে আসমানে গেলো। হুযাইফার বর্ণনা ছাড়া অন্য বর্ণনা মতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় মেম্বারে তাশরিফ নিলেন এবং বললেন: হে লোকসকল! আমার পর তোমাদের মধ্যে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। যদি তার অনুসরণ করো, তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব আর আমার আহলে বাইত। সর্বজ্ঞ ও সুক্ষদর্শী আল্লাহ আমাকে এই সংবাদ দিয়েছে। এই দুটো হাউযে কাউসারে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার দুই আঙ্গুলের মতো কখনো আমার থেকে পৃথক হবে না। (এটা বলে তিনি শাহাদত আঙ্গুল পরের আঙ্গুলের সাথে মিলিয়ে দেখালেন)। আর বললেন: যে এই দুটোকে আকড়ে ধরবে, সে নাজাত পাবে আর যে বিরোধীতা করবে, সে ধ্বংস হবে। হে লোক সকল! আমি কি আল্লাহর রিসালাতের তাবলিগ করেছি? লোকজন বললো: হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আল্লাহ, তুমি সাক্ষি থাকো।
আইয়ামে তাশরিকের শেষদিন ১৩ই জিলহজ্ব সুরা নাসর অবতীর্ণ হলো। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এটাই আমার মৃত্যু সংবাদ। কেননা এটা এর উপরই প্রমাণ বহন করে যে, আমি দ্বীনের কাজ পুরো করেছি। কাজেই মহান সত্ত্বার দিকে আমার মনযোগী হওয়া উচিত। অতঃপর মিনার মসজিদে খইফে প্রবেশ করলেন এবং বললেন: লোকদের ডেকে উপস্থিত করো। লোকজন যখন জমা হলো তখন তিনি খুতবা পড়ে বললেন: হে লোকসকল! আমি তোমাদের মধ্যে দুটো মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি। যার একটা আরেকটা থেকে বড়। একটা আল্লাহর কিতাব। যার একদিকে আল্লাহর হাতে অপরদিকে তোমাদের হাতে। কাজেই তাকে আকড়ে ধরো। আরেকটা আমার ইতরাত। যারা আমার আহলে বাইত। নিঃসন্দেহে আমার সুক্ষদর্শী ও জ্ঞানী আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, এই উভয়টা আমার দুই আঙ্গুলের মতো একটা অপরটা থেকে পৃথক হবে না। যতক্ষণ না হাউযে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হবে। এটা বলে তার উভয় মাধ্যমা আঙ্গুলকে মিলিয়ে দেখালেন, যার একটা আরেকটা থেকে কিছুটা বড় ছিলো। তখন মুনাফিকদের একটা দল[6] একত্রিত হয়ে বললো: মুহাম্মদ স্বীয় আহলে বাইতের মধ্যে ইমামতের স্বীকৃতি দিতে চায়। অতঃপর তাদের মধ্যে থেকে চৌদ্দ ব্যক্তি খানায়ে কা’বায় গিয়ে পারস্পারিক পরামর্শের ভিত্তিতে একটা চুক্তিনামা লিখলো এবং পরস্পর অঙ্গীকারবদ্ধ হলো: মুহাম্মদ যদি মরে যায় বা হত্যা হয়, তবে তার আহলে বাইতের মধ্যে খিলাফতের ভার দেওয়া যাবে না। তখন আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করলেন: ام ابرموا امرا فانا مبرمون ام يحسبون انا لا نسمع سرهم ونجواهم بلى ورسلنا لديهم يكتبون “ওই লোকেরা কি নিজেদের মধ্যেকর চুক্তি মযবুত করে নিয়েছে? তবে আমিও আমার বিধান দৃঢ় করছি। তারা মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথা শুনি না, বরং আমি শুনি। আর আমার রাসুল তথা ফিরিশতারাও তাদের কাছে নিয়জিত। তারা তাদের কথা ও আমল লিপিবদ্ধ করে। হুজায়ফা তার হাদিসে বলে: অতঃপর আল্লাহর রাসুল নির্দেশ দিলেন, সামানাপত্র বের করো আর মদিনায় রওনা হয়ে যাও। সাহনান অবধি পৌঁছানোর পর আল্লাহ রাসুলকে নির্দেশ দিলেন যে, আলির ইমামত লোকদের মধ্যে পৌঁছে দাও। কাজেই তিনি জুহফায় দাঁড়ালেন। লোকজন যখন ধীরস্থীর দাঁড়িয়ে গেলো, তখন জিবরিল এলেন এবং আলির ইমামত প্রকাশ করার জন্য বললেন। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: পরওয়ারদিগার! আমার সম্প্রদায় মুসলিম,[7] এ বিষয়টা যদি প্রকাশ করি, তবে তারা বলবে স্বীয় চাচাতো ভায়ের পক্ষপাতিত্ব করছে।
মাসউদ বিন নাসির সিজিস্তানি স্বীয় কিতাব ‘বিলায়েত’-এ ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করে: জিবরিল যখন জুহফায় অবতীর্ণ হলেন, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি কি মুমিনদের কাছে তাদের জানের থেকেও প্রিয় নয়? লোকজন বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! নিশ্চয়! আমি যার মাওলা আলি তার মাওলা। আল্লাহ, তার সাথে বন্ধুত্ব রাখুন যে আলির সাথে বন্ধুত্ব রাখে আর তাকে শত্রু করুন, যে আলিকে শত্রু করে। আর তাকে সাহায্য করুন, যে আলিকে সাহায্য করে। ইবনু আব্বাস বলেন: আল্লাহর শপথ! সেদিনই লোকদের উপর আলির আনুগত্য ফরয হয়ে গেছে। অতঃপর প্রথম বর্ণনায় বলা হয়েছে: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন জিবরিল এই আয়াত নিয়ে এলেন:
يا ايها الرسول بلغ ما انزل اليك من ربك فى على وان لم تفعل فما بلغت رسالته والله يعصمك من الناس
হে রাসুল: আলির ব্যপারে আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে যে নির্দেশ এসেছে, তা পৌঁছে দিন। যদি তা না পৌঁছান, তবে তার রিসালাতই পৌঁছান নি। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করবেন।
হুজাইফা বলেন: যখন এই আয়াত নাযিল হয়, তখন আমরা গদিরে খোমে ছিলাম। আর এত গরম ছিল যে, যদি যমিনের উপর গোশত রাখা হতো, তবে ভুনা হয়ে যেতো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন: লোকদের ডাকো, যেনো সবাই একত্রিত হয়। সে সঙ্গে মিকদাদ, আবু যর, সালমান ও আম্মারকে গাছের তলা থেকে কাঁটা সরিয়ে এক পাথরের উপর আরেক পাথর রেখে মিম্বার বানানোর নির্দেশ দিলেন। ফলে তারা মেম্বার বানালেন এবং কাপড় দিয়ে তা ঢেকে দিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেম্বারের উপর তাশরিফ রাখলেন এবং একটা জামে মা’নে খুতবা পড়লেন। এমনকি বললেন যে, আমি স্বীয় নফসের ব্যপারে আল্লাহর ইবাদতের স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং তার প্রভুত্বের সাক্ষি দিচ্ছি। আর এই ভয়ে তার প্রত্যাদেশকৃত ওহির ফরমান পালন করছি, যেন আমার উপর মহা মুসিবত আপতিত না হয়। আমাকে প্রত্যাদেশ করা হয়েছে ……… يا ايها الرسول بلغ ما انزل اليك। হে লোকসকল! আমি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ত্রুটি করি নি। তাই তোমাদের এই আয়াত অবতরণের প্রেক্ষাপট বলছি। নিঃসন্দেহে আমার উপর বার বার জিবরিল অবতীর্ণ হয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে নির্দেশ দিচ্ছে যে, সাদা কালো প্রত্যেককেই জানিয়ে দাও যে, আমার চাচাতো ভাই আলি ইবনু আবি তালিব আমার পরে আমার খলিফা ও তোমাদের ইমাম হবে। হে লোকসকল! মুনাফিকরা যা বলে, সে ব্যপারে তো আমার অবগতি রয়েছে। তারা তা প্রকাশ করে না, যা তাদের অন্তরে রয়েছে। অথচ তা তারা খুবই সহজ মনে করে। অথচ আল্লাহর কাছে তা অনেক ভারি! আর আমাকেও আলির এই ব্যপারে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তারা বলে যে, রাসুল যা বলে আলি তা মেনে নেয়। এ জন্যই মুনাফিকরা দেখে যে, আলি সর্বদা আমার সাথে থাকে। আর আমিও সর্বদা তার দিকে মনযোগী থাকি। এমনকি আল্লাহ তাআলা এই আয়াতও অবতীর্ণ করেন: ومنهم الذين يودون النبى ويقولون هواذن অর্থাৎ: মুনাফিকদের একটি দল, যারা পয়গম্বরকে কষ্ট পৌঁছিয়ে থাকে, আর বলে: ওটা কান (অর্থাৎ মুনাফিকরা যে কথা বলে, আল্লাহ তাআলা তা ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দেন) হে রাসুল, তাদের বলে দিন যে, ওই কান তোমাদের থেকে উত্তম। তা আল্লাহ ও মুমিনের জন্য ঈমান এনেছে। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এরকম (গোপন চুক্তিকারী মুনাফিকদের) নাম যদি ইচ্ছে করি, বলে দিতে পারি। তবে এটা জেনে নাও যে, আল্লাহ তাআলা আলিকে তোমাদের অভিভাবক, বিচারক ও ইমাম মনোনীত করেছেন। মুহাজির, আনসার, শহরবাসী, মরুবাসী, আরব, অনারব, গোলাম, আযাদ , ছোট বড় মোটকথা আল্লাহকে এক বলে স্বীকারকারী প্রত্যেক ব্যক্তির উপর তার আনুগত্য ফরয। কাজেই তার নির্দেশ সবার উপরই প্রযোজ্য হবে এবং তার বিধি নিষেধ সবার উপর জারি হবে। যে এটাকে অস্বীকার করবে, সে অভিশপ্ত আর যে সত্যায়ন করবে, সে আল্লাহর রহমাতের চাদরে আবৃত হবে। হে লোকসকল! কুরআনের মধ্যে গবেষণা করো আর তার মুহকাম আয়াতগুলো অনুধাবন করো ও তার উপর আমল করো। আর মুতাশাবিহ আয়াতের অনুসরণ করো। আল্লাহর শপথ! আলি ছাড়া কেউ কুরআনের আয়াতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবে না।
হে লোকসকল! আলি ও তার ঔরসে যেসব সন্তান হবে, তারা হলো ছোটো বোঝা, আর কুরআন হলো বড় বোঝা। এর কোনোটাই একটা আরেকটা থেকে পৃথক হবে না। এ পর্যন্ত যে, আমার কাছে হাউজে কাউসারে উপনীত হবে। আমার পর আলি ছাড়া কারো জন্য বাদশাহি ও রাজত্ব জায়েয নেই। অতঃপর আলির বাহু ধরে নিজের থেকে এক স্তর নিচে স্বীয় ডান পাশে দাঁড় করিয়ে তার হাত উঁচু করে বললেন: হে লোক সকল! তোমাদের প্রাণের চেয়েও অগ্রগামী হাকিম ও বিচারক কে? সাহাবারা বললো: আল্লাহ ও তার রাসুল। ওই সময় বললেন: আমি যার মাওলা ও হাকিম, আলিও তার মাওলা ও হাকিম। হে আল্লাহ! তাকে বন্ধু করুন, যে আলির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে আর তার সাথে শত্রুতা করুন যে আলির সাথে শত্রুতা করে। তাকে সাহায্য করুন যে আলিকে সাহায্য করে আর যে তাকে ছেড়ে দেয়, তাকে ছেড়ে দিন।
লোকসকল! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা আলির বেলায়েত ও ইমামতের শর্তে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন। এর আগে মুমিনদের সম্বোধন করে কোনো আয়াত নাযিল হয় নি।[8] বরং এখানেই এর ধারা আরম্ভ হয়েছে। আর সুরায়ে ‘হাল আতা’ (ঈমান অর্জন ও আল্লাহর সন্তুষ্টির) সাক্ষি কেবল এ জন্যই দেওয়া হয়েছে। এবং অন্য কোনো কারণে তা অবতীর্ণ হয় নি, বরং তাদের শান ও প্রশংসা বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রত্যেক নবিরই বংশধর তার ঔরস থেকে জন্ম লাভ করে, আর আমার বংশধর আলির ঔরস থেকে জন্মগ্রহণ করবে। কেবল দুর্ভাগারাই আলির সাথে শত্রুতা পোষণ করতে পারে আর মুত্তাকিরাই তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। আর সুরা আসর আলির শানেই নাযিল হয়েছে। এই সুরার তাফসির এই যে, এখানে কিয়ামত দিবসের কসম করে মানুষ তথা আলি ও তার আহলে বাইতের দুশমনদের ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে। আর যে আলির বিলায়েতের উপর ঈমান আনবে, স্বীয় দ্বীনি ভাইয়ের সাহায্য সহযোগীতার মাধ্যমে নেক কাজ করবে, অধিকার রক্ষা করবে আর আলি ও তার সন্তানের বেলায়েত স্বীকার করবে, বিশেষত আহলে বাইতের অন্তর্ধন ইমাম (বারো ইমামপন্থীদের আকিদা মতে অস্তিত্বহীন বারোতম ইমাম, যে তৎকালীন বাদশাহর ভয়ে গর্তে ঢুকে এখনো পালাতক আছে এমনকি ইরানে তাদের ক্ষমতা আসার পরও বের হওয়ার সাহস হয় নি আর ইন না শা আল্লাহ কোনোদিন বেরও হবে না)-এর গায়বাতকালে ফিতনা ফাসাদ ও কষ্টের মধ্যে ধৈর্য ধারণের অসিয়ত করবে।
হে লোকসকল! আল্লাহ, তার রাসুল ও সেই নূরের উপর বিশ্বাস স্থাপন করো, যার কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। যে নুর হলো ইমামত। যা আলি ও তার সন্তানদের মধ্যে ইমাম মাহদি আলাইহিস সালাম পর্যন্ত রয়েছে। যার লোকদের থেকে আল্লাহ ও আহলে বাইতের অধিকার আদায় করবে।
হে লোকসকল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। আমার পূর্বেও আল্লাহর নবিগণের মৃত্যু হয়েছে। আমি তাদের সুন্নাতের উপরই প্রতিষ্ঠিত। নিঃসন্দেহে আলি শোকর ও ধৈর্যর গুনাবলী দ্বারা গুনানন্বিত। আমার পর তার ঔরষ থেকেই ইমামদের জন্ম হবে।
হে লোকসকল! তোমাদের পূর্বে অনেক লোকই গোমরাহ হয়েছে। আমিই তোমাদের সিরাতে মুস্তাকিম ও আল্লাহ প্রদত্ত্ব সেই সোজা রাস্তা, আল্লাহ সুরা হামদ (ফাতেহা)-এর মধ্যে যার নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তার কাছে এর প্রার্থনা করবে। নিঃসন্দেহে আমি তোমাদের হক বলে বুঝিয়ে দিয়েছি। আর আমার পর আলি তা বুঝিয়ে দিবে। এই খুতবার পর আমি তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছি যে, তোমরা আমার সাথে মুসাফাহ করো ও আলির হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তার ইমামতের স্বীকৃতি প্রদান করো। সে সঙ্গে এটা মনে রেখো যে, আমি বাইয়াত গ্রহণ করি আল্লাহর জন্য আর আলি বাইয়াত গ্রহণ করে আমার জন্য আর আমি আল্লাহর কাছে তার পক্ষ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করি।
فمن نكث فانما ينكث على نفسه ومن اوفى بما عاهد على الله فسيوتيه اجرا عظيما
তোমাদের মধ্যে যে-ই এই বাইয়াত ভঙ্গ করবে, সে নিজের জন্যই ভঙ্গ করবে। আর অবশ্যই তার এর ক্ষতি পৌঁছাবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কৃত এই অঙ্গীকার পূর্ণ করবে, আল্লাহ সত্ত্বর তাকে মহান প্রতিদান দান করবেন।
হে লোকসকল! তোমরা সকলেই নিজ হাতে আমার সাথে মুসাফাহ করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ আমাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাদের যবান থেকে স্বীকরক্তি নিবো যে, তোমরা আলি ও বাকি ইমামদের বাদশাহিত্ব মেনে নিবে। যারা আমার ও আলির নসল তথা বংশধরদের থেকে হবে। যেমনটা আমি তোমাদের বলেছি যে, আমার বংশধর তার ঔরস থেকে হবে। কাজেই যারা উপস্থিত আছো, তারা অনুপস্থিতদের জানিয়ে দাও। এখন বলো যে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু আপনি আমাদের কাছে পৌঁছেছেন, তার উপর সন্তুষ্ট। আমাদের অন্তর, যবান এবং হাতও আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছে। আমরা এই আকিদার উপরই জীবিত থাকবো আর এই আকিদার উপরই মৃত্যু বরণ করবো এবং কিয়ামত দিবসে এই আকিদার উপর উত্থিত হবো। এর মধ্যে কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধন করবো না। এবং সামান্যতম সন্দেহও করব না। আমাদের থেকে আপনি আল্লাহ, আলি, হাসান, হুসাইন ও অন্যান্য ইমামদের ব্যপারে যে অঙ্গীকার নিয়েছেন, সে অঙ্গীকার আমরা অন্তর ও যবান দ্বারা করছি। তাই তা অন্যকারো আদেশের দ্বারা পরিবর্তনও করবো না। এমনকি অনুপস্থিত যার সাথেই সাক্ষাত হবে, তারকাছেই এ বাণী পৌঁছে দিবো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই খুতবা শুনে চতুর্দিক থেকে লোকজন উঁচু আওয়াজে বলতে লাগলো যে, আমরা শুনেছি আর আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করছি। আর দিল থেকে তার উপর ঈমান আনায়ন করছি। এরপর আমিরুল মুমিনিন আলাইহিস সালামের হাতে তিনি সবাইকে বাইয়াত গ্রহণ করালেন, এমনকি জোহর ও আসরের নামায একসাথে আদায় করে পুরো দিন বাইয়াত নেওয়ার কাজে নিমগ্ন থাকেন। ফলে সময় সংকীর্ণতার দরুন মাগরিব ও এশাও একসাথে আদায় করেন।
এই ঘটনা উল্লেখ করে মোল্লা বাকের মাজলিসি লেখেন: এটা একটা সংক্ষিপ্ত খুৎবা, যে ব্যপারে ওলামায়ে ইমামিয়া এবং বিপক্ষীয় উলামাগণও একমত। বিহারুল আনওয়ার-এ যে খুৎবা লেখা হয়েছে, সেখানে আলি আলাইহিস সালামের শানে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে তার অধিকাংশই উল্লেখ করেছি। এরপর মোল্লা বাকের মাজলিসি বিদায় হজের ভূমিকা ও পূর্ববর্তী ঘটনাই আরো বিস্তারিত লেখেন। আমি সেখান থেকে সংক্ষেপে কেবল ভূমিকাটা লেখার চেষ্টা করবো ইন শা আল্লাহ।
হিজরতের পরবর্তী নয় বছরে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের যখন হজ ও বেলায়েত ব্যতীত দ্বীনের সব বিধি বিধানেরই তালিম দিয়েছিলেন, তখন হযরত জিবরিল আলাইহিস সালাম এসে বললেন: আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়ে বলেছেন, আমি যখন কোনো নবি ও রাসুলকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিই, তখন দ্বীনকে পূর্ণ করে নিই এবং তার হুজ্জাত সৃষ্টিজীবের উপর আবশ্যক করি। আপনার আনিত দ্বীনের এখনো মহা দুটো বিষয় বাকি রয়ে গেছে, যা আপনি লোকদের কাছে পৌঁছান নি। এক. ফরয হজ। দুই. বেলায়াত ও খেলাফত। কেননা আমি কখনো যমিনকে হুজ্জাতে খোদা থেকে মুক্ত রাখি নি। আপনার পরও রাখবো না। হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ তাআলা আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন আপনি শহর, গ্রাম, বন-জঙ্গল, মরুভূমি; সব জায়গার লোকদের জানিয়ে দেন যে, তারা আপনার সাথে হজে যায় এবং তার নিয়ম কানুন শিখে নেয়। যার আসল উদ্দেশ্য ছিল সব জায়গার লোকেরাই যেন সমবেত হয় আর আল্লাহর হুজ্জাত, বেলায়াত ও ইমামতের ঘোষণা শুনে নেয়।
মোটকথা সব মুসলমানই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হজে অংশগ্রহণ করলো। যাদের সংখ্যা মুসা আলাইহিস সালামের আসহাবদের মতো সত্তর হাজারেরও অধিক ছিল; যাদের থেকে হারুন আলাইহিস সালাম বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। আসহাবে মুসা সত্তর হাজার হওয়া সত্ত্বেও সর্বশেষ তারা বাইয়াত ভেঙ্গে দিয়ে সামিরি ও তার গো শাবকের অনুগামী হয়ে গিয়েছিলো। অনুরূপ রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সমসংখ্যক লোকদের থেকে আমিরুল মুমিনিনের খেলাফতের বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তারা বাইয়াত ভেঙ্গে পূর্বের গো শাবক ও অন্য এক সামিরির অনুসরণ করেছিল। যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই যে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থান থেকে তালবিয়া পাঠ করতে করতে যখন আরাফায় পৌঁছালেন, তখন জিবরিল এসে বললো: হে মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেন, আপনি পরিণতির দিকে পৌঁছাচ্ছেন আপনার হায়াতও শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। আমি আপনাকে সে বিধান পালনেরই কষ্ট দিবো, যা পালন ব্যতীত আপনার কোনো পথ নেই। আর এটা আবশ্যক যে, আপনি আপনার সমস্ত কাজের উপর অছিয়াতকে প্রাধান্য দিবেন এবং ইলমে ইলাহি, পূর্ববর্তী নবিদের যাবতীয় ইলম, মুজিযা, হাতিয়ার ও রাজত্ব আমার সৃষ্টিজীবের হুজ্জত ও নিদর্শন আলি আলাইহিস সালামকে ওয়াসি ও খলিফা নিযুক্ত করে যাবেন।
কাজেই আপনি তাকে সমস্ত মাখলুকের উপর নিযুক্ত করত: হিদায়াতের নিশানা এবং সেই বাইয়াত ও অঙ্গীকারকে স্মরণ করিয়ে দিবেন, যা আল্লাহ তাআলা রোজে আযালে সমস্ত রূহ থেকে নিয়েছিলেন। যেটা ছিল আমার ওলি আলি আলাইহিস সালামের ব্যপারে সমস্ত মুমিন ও মুমিনার বিলায়াতের অঙ্গীকার। কেননা আমি কোনো নবিকেই তার দ্বীনের পূর্ণতা, শত্রুর সঙ্গে শত্রুতা, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও তার উপর কৃত নিয়ামতকে পূর্ণতা দান ব্যতীত দুনিয়া থেকে উঠাই নি। আর এখন আমার নিয়ামতের পূর্ণতা ও একত্ববাদের পরিপূর্ণ স্বীকৃতি আমার ওলির অনুসরণের উপর। কাজেই তোমরা তার অনুসরণ করবে। তবেই আজকের মুসলমানদের উপর আমার নিয়ামত ও দ্বীন পূর্ণ করবো। আর আমি তো দ্বীন ইসলাম কেবল আমার ওলি ও সব মুমিন ও মুমিনার মাওলা আলির আনুগত্যের সাথে পছন্দ করেছি। আর এই আলি হলো আমার একনিষ্ট বান্দা ও আমার পয়গাম্বরের ওয়াসি ও তার পরবর্তী খলিফা। আমার সৃষ্টির উপর আমার হুজ্জাত। তার আনুগত্য আমার পয়গাম্বর মুহাম্মাদের আনুগত্য। আর উভয়ের আনুগত্যই হলো আমার আনুগত্য। কাজেই যে আলির আনুগত্য করবে সে আমার আনুগত্য করলো আর যে আলির সাথে নাফরমানি করবে, সে আমার সাথে নাফরমানি করলো। আমি তাকে আমার ও আমার সৃষ্টিজীবের মধ্যে একটা নিদর্শন বানিয়েছি। যে তার ইমামতের স্বীকৃতি দিবে সে মুমিন আর যে তার ইমামতকে অস্বীকার করবে, সে কাফের। যে ব্যক্তি তার ইমামতের সাথে অন্য কারো ইমামতকে শরিক করবে, সে মুশরিক। যে ব্যক্তি তার বিলায়েতকে স্বীকার করা অবস্থায় আমার কাছে আসবে, সে জান্নাতে যাবে আর যে তার সঙ্গে শত্রুতার হালাতে আমার কাছে আসবে, সে জাহান্নামে যাবে। কাজেই হে মুহাম্মদ! লোকদেরকে আলির পরিচয় জানিয় দিন। আর তার বিলায়াতের ব্যপারে আমার সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দিন। কিন্তু রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের ব্যপারে ভয় করলেন যে, তারা তাদের কুফুরি প্রকাশ করে দিবে। কারণ আমিরুল মুমিনিন আলাইহিস সালামের সাথে তাদের শত্রুতা তিনি জানতেন…
এরপর বাকি ঘটনা পূর্বের মতোই। তবে এই বর্ণনাটা আরেকটু বিস্তারিত। আর অন্যান্য বর্ণনা এরচেয়েও বড়। সবগুলো বর্ণনাই আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর মিথ্যা ফযিলত, গোস্তাখে রাসুল ও সাহাবা বিদ্বেষ দ্বারা পরিপূর্ণ। যার মধ্যে রয়েছে কালামুল্লাহর মধ্যে মনগড়া বৃদ্ধির মতো কুফুরি উপখ্যান।
গদির দিবসের হাকিকত
গদিরে খুমের ঘটনা ঘটেছিল ১০ হিজরির ১৮ই জিলহজ। কিন্তু একে কেন্দ্র করে দিবস পালন শুরু হয় ৩৫২ হিজরি এই ইসনা আশারিয়ার বনি বুওয়াইহের শাসক মুঈহযুদ্দৌলার হাত ধরে। এবং এ দিবসকে শিয়ারা ঈদের দিন সাব্যস্ত করে। তাও সাধারণ কোনো ঈদ নয়—বরং ঈদে আকবার বা সকল ঈদের ঈদের বড় ঈদ। আর ঈদ মানেই উৎসব। অর্থাৎ এ দিবসটা শিয়াদের জন্য মহা উৎসব। সাদা দৃষ্টিতে তাকালে এটা ওদের মতবাদীয় অনুষ্ঠান মনে হবে কেবল। কিন্তু গভীরভাবে তাকালে বুঝতে পারবেন ভয়ংকর তথ্য। মূলত উসমান রাদি. শহিদ হয়েছিলেন ১৮ই জিলহজ। ওরা উসমান রাদি. এর শাহাদাত উদযাপনের লক্ষ্যে গদিরকে ঢাল বানিয়ে এ দিনে উৎসব পালন করে। যা পাকিস্তানের শিয়া সদর মুহাম্মদ হাসনাইন নাজফি তার কিতাবে লিখেছেন।[9] এই রাতে ওদের আনন্দ উৎসবের পরিমাণ এতো বেড়ে যায় যে, লিফলেট টানিয়ে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে রাত জেগে মুতার নামে জেনার অনুষ্ঠান করে।
আসলে এ উৎসবের মধ্যে আলি রাদি. এর ইমামতের পূর্ণতা খোলস মাত্র। কেবল এক সাহাবির ইন্তেকালের আনন্দ প্রকাশই মূল লক্ষ্য। যেমন ইরানের কাশানে সুজাউদ্দীন বা দিনের বাহাদূর নামে এক ব্যক্তির মাজার রয়েছে। অন্যান্য মাজারের তুলনায় এই মাজারে আগত লোকদের সংখ্যা বেশিই থাকে। হুসাইন মুসাবির ভাষায় এটা উমর রাদি. এর হত্যাকারী আবু লু লু—এর কবর। দর্শক এর থেকেই আপনারা গদির দিবসের হাকিকত অনুধাবন করতে পারেন।
[1] আস-সাওয়ায়িকুল মুহরিকা: ৫৮, মাকতাবাতুল হাকিকাহ, ইস্তাম্বুল।
[2] ফতহুলবারি: মানাকিবু আলি ইবনি আবি তালিব: ৭/৯৫ সুলতান আবদুল আজিজ আলে সাউদ-এর অর্থায়নে প্রকাশিত গ্রন্থ, প্রথম প্রকাশ: ১৪২১ হিজরি।
[3] হক্কুল ইয়াকিন: ১/১০৮, (উর্দু তরজমা)মজলিসে ইলমে ইসলামি পাকিস্তান।
[4] তানযিহুশ শরিয়া: ১/৪০৭ দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ, বাইরুত, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৪০১ হি.।
[5] উদ্দেশ্য আবু বকর, উমার, উসমান ও অন্যান্য সাহাবাগণ। রাদিয়াল্লাহু আনহুম। ওয়া লা’নাতুল্লাহি আ’লা আ’দায়িহিম।
[6] উদ্দেশ্য আবু বকর, উমার, উসমান ও শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ। রাদিয়াল্লাহু আনহুম। ওয়া লা’নাতুল্লাহি আ’লা আ’দায়িহিম।
[7] শিয়াদের পরিভাষায় মুসলিম মুনাফিককে বলে আর পাক্কা মুসলমানকে ওরা মুমিন বলে থাকে। এ জন্য ওরা সর্বদাই নিজেদের মুমিন বলে আখ্যায়িত করে থাকে আর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কাউকে মুসলিম বলে থাকে, সে আইম্মায়ে মুজতাহিদিন, তাবেয়ি বা সাহাবিই হোক না কেনো! এ জন্যই ওরা ঐক্যের শ্লোগানের ক্ষেত্রে ‘ইত্তিহাদ বাইনাল মুসলিমিন’ বলে থাকে, মুমিনিন বলে না। কারণ ওদের দৃষ্টিতে আমরা মুমিন না বরং মুসলিম তথা মুনাফিক।
[8] অর্থাৎ: তাদের দাবি মতে কুরআনে সম্বোধন করলে হে লোক সকল বা মুসলমান বলে করা হয়েছে। মুমিন বলে করা হয় নি। কারণ মুমিন হওয়া আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইমামত মানার উপর নির্ভরশীল। কেননা এই ইমামতের শর্তেই রাসুলের দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে। কাজেই যে আলি রাদিয়াল্লাহুর বিলা ফসল খিলাফত ও ইমামত মানলো, সে পরিপূর্ণ দ্বীন মানলো ও মুমিন হলো।
[9] রুসুমুশ শিয়া ফি মিযানিশ শরিয়া: ৩১৫ পৃ.।


Leave a comment