শিয়াবাদের অসারতা

(১ম পর্ব)

মূল

ইমামে আহলুস সুন্নাহ আবদুশ শাকুর ফারুকি লাখনবি রহ.

অনুবাদ, তাখরিজ ও তা’লিক

মাহদি হাসান কাসেমি

লেখকের ভূমিকা

পৃথিবীতে শিয়া মাজহাবের মতো বিবেকবর্জিত ও অযৌক্তিক কোনো মতবাদ নেই। না তাদের মৌলিক আকিদা, না শাখাগত কোনো বিষয়; কোনোটিই সুস্থ বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিয়ারাও জানে যে, তারা যে মতবাদের উদ্ভাবন করেছে, তার কোনো একটি কথাও বিবেকসম্মত নয়। এ কারণেই তারা এ হাদিস বর্ণনা করে যে, মাসুম ইমামগণ বলেছেন—

إِنَّ حَدِيثَنَا صَعْبٌ مُسْتَصْعَبٌ، لَا يَحْتَمِلُهُ إِلَّا نَبِيٌّ مُرْسَلٌ أَوْ مَلَكٌ مُقَرَّبٌ أَوْ عَبْدٌ مُؤْمِنٌ امْتَحَنَ اللهُ قَلْبَهُ لِلْإِيمَانِ

“আমাদের হাদিস অত্যন্ত কঠিন। তা কেবল নবি-রাসুল, নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা অথবা সেই মুমিনই ধারণ করতে পারে, যার অন্তরকে আল্লাহ তাআলা ঈমানের জন্য পরীক্ষা করেছেন।[1]

এটাই তাদের মাজহাবের বাস্তবতা। অথচ তাদের মুজতাহিদ ও ইমামগণ আবার দাবি করেন, একমাত্র তাদের ধর্ম ও মতবাদই বিবেকসম্মত। যদি বিষয়টি এমনই হতো, তবে আমাদের জিজ্ঞাসা করতেই হয়—

১. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তার ‘বাদা’ (البداء) হয়; অর্থাৎ তিনি পূর্বে কোনো বিষয় জানতেন না, পরে তা জানতে পারেন। ফলে তার বহু ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয় এবং তিনি মত পরিবর্তন করেন। উপরন্তু এই আকিদাকে এত গুরুত্বপূর্ণ সাব্যস্ত করা যে, কোনো নবি বা রাসুল যতক্ষণ না এর স্বীকৃতি দিয়েছেন, ততক্ষণ তিনি নবুওয়াতই পাননি! এ কথা কী বিবেকসম্মত?

২. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তিনি রাসুলের সাহাবিদের ভয় পেতেন; ফলে কিছু বিষয় গোপনে সম্পন্ন করেছেন! এ বিশ্বাস কি যুক্তিসংগত?

৩. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করা যে, তিনি বান্দার বিবেকের অধীন; তার ওপর ইনসাফ করা ওয়াজিব; আর বান্দার জন্য যা অধিক কল্যাণকর, তা করাও আল্লাহর জন্য আবশ্যক। এ কারণেই প্রত্যেক যুগে একজন মাসুম ইমামের অস্তিত্ব বজায় রাখা তার ওপর ওয়াজিব। শিয়াদের এই আকিদা অনুযায়ী যদি কথিত ইমামের অস্তিত্ব না থাকে, তবে আল্লাহর ওপর ওয়াজিব পরিত্যাগের অভিযোগ আরোপিত হয়। অথচ তাদের এক ইমাম সম্পর্কে বিশ্বাস হলো, তিনি এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে গুহায় অবস্থান করছেন, যদিও তার থাকা-না থাকা সমান; কারণ তার থেকে কেউ উপকৃত হয়নি এবং কারও সঙ্গে তার সাক্ষাৎও হয়নি। তবুও এ ধরণের বিশ্বাস কোন বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

৪. আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তিনি যখন ক্রোধান্বিত হন, তখন তার বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না—এ কথা কি যুক্তিযুক্ত?

৫. অগ্নিপূজকদের এই অনুসারীরা এ বিশ্বাসও রাখে যে, সব কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ নন; বরং বান্দাও বহু বিষয়ের স্রষ্টা। ফলে আল্লাহর খালিকিয়্যাত বা স্রষ্টাসত্তায় অসংখ্য মানুষ শরিক হয়ে যায়। এ আকিদা ধারণ করার পরও নিজেদের একত্ববাদী দাবি করা কীভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে?

বরং শিয়াদের এ আকিদা অগ্নিপূজকদের বিশ্বাস থেকেও কয়েক ধাপ সরেষ। কারণ অগ্নিপূজকরা অন্তত দুই স্রষ্টায় বিশ্বাস করে—একজন কল্যাণ ও আলোর স্রষ্টা, আরেকজন অকল্যাণ ও অন্ধকারের স্রষ্টা। এরপরও শিয়ারা কীভাবে একত্ববাদী আর অগ্নিপূজকরা মুশরিক? এ দাবি সত্যিই বিস্ময়কর!

৬. নবিগণ সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তাদের মধ্যে কুফরির মৌলিক উপাদান বিদ্যমান ছিল! এটা কোন বিবেকের দাবি?

৭. এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, নবিদের থেকে এমন কিছু ভুল সংঘটিত হয়েছে, যার কারণে তাদের থেকে নবুওয়াতের নূর ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে! এ কথা কি আকলসম্মত?

৮. নবিগণ সম্পর্কে এ ধারণা রাখা যে, তারা মাখলুকের ভয়ে আল্লাহর বিধান প্রচার করা থেকে বিরত থেকেছেন। এমনকি সাইয়্যিদুল মুরসালিন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সাহাবিদের ভয়ে কুরআনের বহু আয়াত গোপন করেছেন, যা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না এবং কোনোদিন জানতেও পারবে না! এ বিশ্বাস কোন বিবেক সমর্থন করে?

৯. নবিগণ সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তারা আল্লাহর প্রদত্ত পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন; আল্লাহ বারবার পুরস্কার দিয়েছেন আর তারা বার বার তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। যদি আল্লাহ আরো কিছুর প্রলোভন দিতেন, তবে তারা তা গ্রহণ করতেন! এ ধারণা কী গ্রহণযোগ্য?

১০. নবিগণ সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তারা তাদের দাওয়াত ও শিক্ষার বিনিময়ে মানুষের কাছে প্রতিদান কামনা করতেন, আর আল্লাহ তাআলা তাদের এ কাজের অনুমতিও দিয়েছিলেন! এটা কোন বিবেকের কথা?

১১. এ বিশ্বাস রাখা যে, ইসলামি রাষ্ট্র যখন আর্থিক সংকটে ছিল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুকালে জিহাদের সম্পদের একটি বড় অংশ কেবল নিজের কন্যার ভরণপোষণের জন্য রেখে গিয়েছিলেন! এ দাবি কতটুকু যুক্তিসংগত?

১২. কুরআনুল কারিম সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তাতে পাঁচ ধরনের পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে—কোথাও হ্রাস, কোথাও বৃদ্ধি, কোথাও শব্দ পরিবর্তন, কোথাও অক্ষর পরিবর্তন এবং কোথাও আয়াত ও সূরার বিন্যাসে পরিবর্তন। ফলে বর্তমান কুরআনে না রয়েছে ভাষার অলংকার, না রয়েছে বাগ্মিতা, না রয়েছে অবিকৃত মুজিজার স্বরূপ বৈশিষ্ট্য। বরং কুরআনের পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামের ভিত্তিই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এসব বক্তব্য কি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি চরম অবমাননা নয়? এতসব বলার পরও দ্বীন অক্ষুণ্ণ আছে দাবি করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

১৩. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিতা স্ত্রীগণ—যাদের কুরআনে ‘মুমিনদের জননী’ বলা হয়েছে; তাদের সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা যে, তারা মুনাফিক ছিলেন, দুনিয়ালোভী ছিলেন; অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিজ দাম্পত্যে বহাল রেখেছিলেন! এ ধারণা কি বিবেকসম্মত?

১৪. এ বিশ্বাস রাখা যে, হযরত আলী রাদি.-কতৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের তালাক দেওয়ার অধিকার ছিল এবং তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের বহু বছর পরে হযরত আয়েশা রাদি. কে তালাক দিয়েছিলেন! এ বিশ্বাস কতটুকু যুক্তিসংগত?

১৫. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের আহলে বাইত থেকে বের করে দেওয়া কি বিবেকসম্মত? অথচ ‘আহলে বাইত’ শব্দটি অভিধান, আরবদের পরিভাষা এবং কুরআনের ব্যবহার—সব দিক থেকেই স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু শিয়ারা রাসুলের স্ত্রীদের আহলে বাইত থেকে বের করে দেয়, অথচ যাদের তিনি মুহাব্বত করে রূপক অর্থে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তাদেরকেই খাস আহলে বাইত বলে দাবি করে!

চলবে…


[1] আল কাফি: ১/২৫১, বাসায়িরুদ্দারাজাত: ২০ পৃ. হা: ১, ভিন্ন সনদে: ২২ পৃ. হা. ৯,  রিজালুল কাশশি: ১৯৩ পৃ. হা.৩৪১, তাফসিরে ফুরাত: ১১৪ পৃ. হা. ১১৬, আল ওয়াফি: ৩/৬৪৩, হা. ১২৩৫।



Leave a comment