সূচনা
আশুরাকে কেন্দ্র করে শিয়াদের মধ্যে কয়েকটি বিশেষ রীতি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: কালো পোশাক পরিধান করা, মাতাম বা বিলাপ করা এবং শরীর ও মুখমণ্ডলে আঘাত করা। সাধারণত এসব আমলকে কারবালার শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব কর্মকাণ্ড কি সত্যিই আহলে বাইত ও শিয়াদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ দ্বারা সমর্থিত?
শিয়া সূত্রসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কালো পোশাক, বিলাপ, বুক চাপড়ানো, মুখে আঘাত করা, চুল ছেঁড়া কিংবা কাপড় ছিঁড়ে শোক প্রকাশ—এসব সুস্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ।
কালো পোশাক সম্পর্কে শিয়া কিতাবের বক্তব্য
শায়খ সাদূক মান লা ইয়াহযারুহুল ফকিহ (১/২৫১)-গ্রন্থে আলি রাদি. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তার সঙ্গীদের বলতেন:لا تلبسوا السودا فإنه لباس فرعون “কালো পোশাক পরিধান করো না; কারণ তা ফেরাউনের পোশাক।”
একই বর্ণনা হুর আমিলী ওসাইলুশ শিয়া (৪/৩৮৩)-এ উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া মান লা ইয়াহযারুহুল ফকিহ (১/২৫২) এবং ওসাইলুশ শিয়া (৪/৩৮৪)-এ কালো পোশাককে জাহান্নামীদের পোশাক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কালো পোশাককে শত্রুদের পোশাক বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
এমনকি কালো টুপি পরে নামাজ পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জাফর সাদিক বলেন: لا تصل فيها فإنها لباس أهل النار “এটি পরে নামাজ পড়ো না; কারণ এটি জাহান্নামবাসীদের পোশাক।”
(মান লা ইয়াহযারুহুল ফকিহ, ১/২৫১; ওসাইলুশ শিয়া, ৪/৩৮৩)
আমরা শিয়া গ্রন্থসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী দেখতে পেলাম যে, কালো পোশাককে ফেরাউন, শত্রু ও জাহান্নামিদের পোশাক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মুসিবতে ধৈর্যের নির্দেশ
কুরআনের আয়াত:—يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا এর ব্যাখ্যায় তাফসিরে কুম্মির (১/১২৯)-এ বলা হয়েছে:
اصبروا على المصائب وصابروا على الفرائض অর্থাৎ, “তোমরা মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করো এবং ফরজসমূহ আদায়ে দৃঢ় থাকো।”
এ প্রসঙ্গে শিয়া কিতাবসমূহে বহুল বর্ণিত একটি হাদিস হলো:
الصبر من الإيمان بمنزلة الرأس من الجسد، فإذا ذهب الرأس ذهب الجسد، وكذلك إذا ذهب الصبر ذهب الإيمان
“ঈমানের সঙ্গে ধৈর্যের সম্পর্ক দেহের সঙ্গে মাথার সম্পর্কের মতো। মাথা চলে গেলে যেমন দেহ থাকে না, তেমনি ধৈর্য চলে গেলে ঈমানও থাকে না।”
বর্ণনাটি আল কাফি (২/৮৯)-এ এসেছে। এছাড়া ওসাইলুশ শিয়া, বিহারুল আনওয়ার, মিযানুল হিকমাহ, আল ওয়াফি এবং নাহজুল বালাগাহসহ বহু গ্রন্থে বিভিন্ন শব্দে হাদিসটি উদ্ধৃত হয়েছে।
অতএব শিয়া বর্ণনাগুলোর মূল শিক্ষা হলো—মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করা, বিলাপ বা আত্মনিগ্রহ নয়।
মাতাম, বিলাপ ও শরীরে আঘাত সম্পর্কিত বর্ণনা
আল কাফি (৫/৫২৭)- কিতাবুন নিকাহের সিফাতু মুবায়াতিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়া আলিহি আন-নিসা’ অর্থাৎ মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণের শর্ত সম্পর্কিত অধ্যায়। উক্ত অধ্যায়ের ৫ নাম্বার হাদিসে উল্লেখ রয়েছে; জাফর সাদিক রহ. বলেন: মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে পুরুষরা বায়াত হলো। এরপর মহিলাদের পালা এলে সুরা মুমতাহিনার ১৩ নং আয়াত অবতীর্ণ হলো। যেখানে চুরি না করা, যেনা না করা, সন্তানকে হত্যা না করা, অপবাদ না দেওয়া এবং সৎ কাজে আল্লাহর নাফরমানি না করার নির্দেশ রয়েছে।
মহিলারা জিজ্ঞেস করল: ইয়া রাসুলাল্লাহ কোন সৎ কাজের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের বললেন যে, নাফরমানি করবে না? উত্তরে তিনি বললেন যে, বিপদের সময় চেহারায় চপেটাঘাত করবে না, বুক চাপড়াবে না, চুল ছিঁড়বে না, কাপড় ছিঁড়বে না, কালো পোশাক পড়বে না এবং হায় ধ্বংস-হায় ধ্বংস জাতীয় বিলাপ করবে না এবং কবরের কাছে আর্তনাদ করবে না আর মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করবে না।
একই বর্ণনা বিহারুল আনওয়ার (৭৯/৭৭)-এও রয়েছে।
কাফি (৩/২২৩)-এর হাশিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে: يحرم اللطم والخدش وجز الشعر إجماعاً অর্থাৎ, “মুখমণ্ডল বা বুক চাপড়ানো, শরীর ক্ষতবিক্ষত করা এবং চুল ছেঁড়া সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।”
একই বক্তব্য যিকরুশ শিয়া ফি মিযানিশ শরিয়া (২/৫৬)-গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে।
বিলাপ জাহিলিয়াতের কাজ
মান লা ইয়াহযারুহুল ফকিহ (৪/২৭৬)-এ বর্ণিত হয়েছে: النياحة من عمل الجاهلية “বিলাপ জাহেলিয়াতের যুগের কাজ।” একই বর্ণনা ওসাইলুশ শিয়া (৩/২৭২) এবং আল আকলু ওয়ান নাকলু ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ (পৃ. ২৬৩)-এ পাওয়া যায়। এছাড়া মান লা ইয়াহযারুহুল ফকিহ (৪/২৭২-২৭৩)-এ বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা রাদি.-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন: “আমি মারা গেলে তুমি মুখে আঁচড় দিও না, চুল খুলে শোক করো না, ধ্বংস-ধ্বংস বলে চিৎকার করো না এবং আমার জন্য বিলাপ ও আর্তনাদ করো না।” এরপর তিনি বলেন, এটাই সেই ‘মারুফ’ বা সৎকাজ, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ﴿وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ﴾ (বিহারুল আনওয়ার, ৭৯/৭৬)
কারবালার ময়দানে হুসাইন রাদি.-এর নির্দেশনা
শায়খ মুফিদের আল ইরশাদ (২/৯৪) গ্রন্থে চতুর্থ ইমাম যয়নুল আবেদিন থেকে বর্ণনা করেন: কারবালার দিন শাহাদাতের পূর্বে হুসাইন রাদি. এর বোন যয়নাব বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। (ঘটনাটি দীর্ঘ; এখানে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু উদ্ধৃত করছি)—
ইমাম হুসাইন আ. উঠে দাঁড়ালেন, তার মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন এবং বললেন, “হে আমার প্রিয় বোন! আল্লাহকে ভয় করো এবং আল্লাহর ফয়সালার উপর ধৈর্য ধারণ করো। জেনে রাখো, পৃথিবীর সকল মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। আসমানের অধিবাসীরাও থাকবে না। আল্লাহ তালার সত্তা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনিই নিজ ক্ষমতায় সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করেছেন, পুনরায় জীবিত করবেন এবং সকলেই একাকী তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করবে। আমার পিতা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন, আমার মাতা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন এবং আমার ভাইও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। আর প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম আদর্শ।”
এরপর তিনি স্বীয় হাত সরিয়ে বললেন: “হে বোন! তোমার প্রতি আমার অধিকারের শপথ দিয়ে বলছি, আমার শাহাদাতের পর তুমি আমার জন্য কাপড় ছিঁড়ো না, নিজের মুখমণ্ডলে আঘাত করো না এবং ‘হায় হায়’ বলে বিলাপ করো না।”
কারবালার ময়দানে দেওয়া এই নির্দেশনা ৩৫২ হি. চালু হওয়া মাতাম-সংস্কৃতির সঙ্গে স্পষ্টতই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি তার বর্ণনাটি একবার পাঠ করত!
রাসুলের আমল
এছাড়া আল-কাফি (৩/১২৩)-এ রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র তাহেরের ইন্তেকালের একটি বর্ণনা এসেছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা রাদি.-কে অতিরিক্ত শোক ও বিলাপ থেকে বিরত থাকতে বলেন। তখন তিনি বললেন, “আমার চোখে অশ্রু চলে আসছে।” উত্তরে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাকে জান্নাতের দরজার সামনে দাঁড়ানো পাবে আর সে তোমাকে দেখে হাত ধরে জান্নাতে প্রবেশ করাবে?”
খাদিজা রাদি. জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি সত্যিই হবে?” তিনি বললেন: “যখন আল্লাহ কোনো বান্দার হৃদয়ের ফল (সন্তান) কেড়ে নেন, আর সে সওয়াবের আশায় ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর প্রশংসা করে, তারপরও আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন—এমনটি হতে পারে না।”
সুতরাং মৃত্যু বা মুসিবতের সময় যেভাবে আনুষ্ঠানিক শোক, মাতাম, বুক চাপড়ানো, মুখমণ্ডলে আঘাত করা, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা কিংবা বিলাপের রীতি পালন করা হয়, তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা আহলে বাইতের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের নির্দেশনা ছিল ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রতিদানের আশা করা।
বর্তমানে যারা এসব কর্মকে ধর্মীয় ইবাদত বা সওয়াবের কাজ হিসেবে উপস্থাপন করে, প্রথমতো তাদের এসব কর্মকাণ্ডের সূচনা ৩৫২ হিজরি; যখন রাসুলতো দূর কী বাত তাদের ইমামরাও অনুপস্থিত। কেননা তাদের শেষ ইমামের অন্তর্ধান ছিল ২৬০ হিজরি। তাই তারা এসব কর্ম নিঃসন্দেহে রাসুল ও আহলে বাইতের নির্দেশনার বাইরে করে। যদি মাতামের কোনো প্রয়োজনই থাকত, তবে তাদের ইমামগণই সে ধারার প্রচোলন করত। অবশ্য তারা এখন যে দলিল প্রদান করে, তার ভিত্তি বিচ্ছিন্ন বর্ণনা কিংবা বিভিন্ন ঘটনা নির্ভর। যার সঙ্গে নির্দিষ্ট ঘটনাকেন্দ্রিক মাতাম সম্পর্কিত আচরণের কোনো সম্পর্ক নেই। এ প্রসঙ্গে তারা আহলুস সুন্নাহর কিতাব থেকেও দলিল দেওয়ার অপচেষ্টা করে। যার কিছু অগ্রহণযোগ্য হাদিস, কিছু অপব্যাখ্যা আর কিছু মৃত্যুর পর স্বাভাবিক ক্রন্দন সম্পর্কিত বর্ণনা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার পুত্রের ইন্তেকালে কেঁদেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর চোখে অশ্রু এসেছিল। এটি মানবিক ও স্বাভাবিক বিষয়। প্রিয়জন হারালে হৃদয় ব্যথিত হবে এবং চোখে পানি আসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই শোককে কেন্দ্র করে বিলাপ, আহাজারি, শরীরে আঘাত বা জাহেলিয়াতের রীতিকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অতএব, স্বাভাবিক ক্রন্দন আর মাতাম এক জিনিস নয়। প্রথমটি মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ; দ্বিতীয়টি একটি স্বতন্ত্র আচরণ, যা বহু বর্ণনায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই এসব কার্যক্রম শরয়ি নির্দেশনা মনে করা সুস্পষ্ট বোকামী; বরং তা ধর্মহীন কাজ।


Leave a comment